ফাইলটা হাতে নিয়ে আমি যখন পুরনো দোকানটার সামনে দাঁড়ালাম, লালবাগের গলিটায় তখন মাগরিবের আজান শেষ হচ্ছে।
ফাইলের ওপরে লাল স্টিকারে লেখাঃ ডিফল্টার। নাম মোঃ রফিকুল করিম। ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া তিন লাখ বিয়াল্লিশ হাজার সাতশো টাকা। চৌদ্দ মাস কোনো পেমেন্ট নেই। ফোন বন্ধ। ঠিকানা: করিম স্টোর, লালবাগ।
আমি একটা বেসরকারি ব্যাংকের রিকভারি অফিসার। সোজা বাংলায়, পাওনাদার। ব্যাংকের হয়ে মানুষের দরজায় যাই, তাগাদা দিই, ভয় দেখাই না, কিন্তু ভয়টা যেন বোঝা যায় সেভাবে কথা বলি। গত চার বছরে দুইশোর বেশি দরজায় গিয়েছি।
দোকানটা বেশ পুরনো। কাঠের তাক, চটের বস্তায় চাল-ডাল, কাচের বয়ামে লজেন্স, কাউন্টারের ওপর একটা পিতলের দাঁড়িপাল্লা। দরজার মাথায় টিনের সাইনবোর্ড, রঙ উঠে গেছে: করিম স্টোর, স্থাপিত ১৯৬২। তার নিচে, ছোট অক্ষরে হাতে লেখা: এখানে বাকিতে জিনিস দেয়া হয়। তবে মানুষ কেনা হয় না।
লাইনটা পড়ে আমার গলায় একটা অস্বস্তি জমল। কেন, তখন বুঝিনি।
কাউন্টারের পেছনে বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ। মাথায় সাদা টুপি, গায়ে হাতাকাটা গেঞ্জি, চোখে সুতো দিয়ে বাঁধা চশমা। সামনে একটা মোটা লাল মলাটের খাতা খোলা, তাতে কিছু লিখছিলেন দোয়াতের কলম দিয়ে। আমি গলা খাঁকারি দিলাম।
“রফিকুল করিম সাহেব আছেন? আমি ব্যাংক থেকে এসেছি।”
বৃদ্ধ কলমটা দোয়াতে রাখলেন। আস্তে আস্তে চশমা খুললেন। আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ, যেন আমার মুখে কিছু পড়ছেন।
“রফিক আমার পোলা,” তিনি বললেন। “দুই বছর আগে মরসে হার্ট অ্যাটাকে। ফজরের নামাজের পরে দোকান খুলতে আইসা এই কাউন্টারের সামনে পইড়া গেসিল।”
হাতের ফাইলটা হঠাৎ খুব ভারী লাগল আমার। আমাদের ডেটাবেইজে মৃত্যুর তথ্য আপডেট হয় না, যদি না পরিবার কাগজ জমা দেয়। আর পরিবার কাগজ জমা দেয় না, কারণ তারা জানেই না যে দিতে হয়। ব্যাংক তাই চৌদ্দ মাস ধরে একজন মৃত মানুষকে ফোন করছে, এসএমএস পাঠাচ্ছে, সুদের ওপর সুদ জুড়ছে। আর আজ পাঠিয়েছে আমাকে।
“দুঃখিত, চাচা। আমি জানতাম না।”
“জানবা ক্যামনে।” বৃদ্ধ একটা টুল এগিয়ে দিলেন। “বসো, চা খাও। তোমার মুখ দেইখা মনে হইতাসে তুমি নিজেও কারো কাছে বাকি।”
আমি চমকে উঠলাম। তারপর হেসে ফেললাম, অস্বস্তির হাসি। বৃদ্ধ ভুল বলেননি। আমার নিজের দুইটা ক্রেডিট কার্ড মিলিয়ে চার লাখের মতো দেনা। ফোনের কিস্তি, বিয়ের খরচের পার্সোনাল লোন, বাইকের ইএমআই। প্রতি মাসের পঁচিশ তারিখে বেতন ঢোকে, আর সাতাশ তারিখের মধ্যে বেরিয়ে যায়। আমি বাকি সবার মতো মিনিমাম পেমেন্ট দিই। যে মানুষ সারাদিন অন্যের দেনা আদায় করি, সে রাতে নিজের দেনার হিসাব করে ঘুমাতে পারি না।
আম্মার একটা কথা আছে। দেনা নিয়া ঘুমাইতে নাই। আব্বা মারা যাওয়ার পর আম্মা নিজের হাতের চুড়ি বেচে আব্বার সব দেনা শোধ করেছিলেন। আমার বয়স তখন তিন। আম্মা আজও বলেন, “সব শোধ করসি। খালি একটা বাদে। লালবাগের কোন এক মুদি দোকান, তোর আব্বা মাঝে মাঝে বাকিতে চাল আনতো। নাম মনে নাই। ত্রিশ বছর খুঁজছি, পাই নাই।”
তখনো জানতাম না,আমি ঠিক কোন দোকানের সামনে বসে আছি।
একটা ছেলে রঙ চা দিয়ে গেল কাচের গ্লাসে। বৃদ্ধ, যাঁর নাম পরে জেনেছিলাম হাজী আব্দুল করিম, লাল খাতাটা আমার দিকে একটু ঘুরিয়ে দিলেন।
“চিনো এইটা কী?”
“বাকির খাতা।”
“হ। বাষট্টি সাল থেইকা।”
তিনি খাতার পাশে রাখা আরও পাঁচ-ছয়টা পুরনো খাতার দিকে ইশারা করলেন, মলাট ছিঁড়ে গেছে, পাতা হলুদ। “এই মহল্লার তিন পুরুষের নাম এইখানে। কে কবে কী নিসে, কত বাকি, কবে শোধ দিসে। আর এইগুলা দেখো।”
তিনি একটা পুরনো খাতা খুললেন। নামের পর নাম, অঙ্কের পর অঙ্ক। আর অনেকগুলো নামের ওপর দিয়ে লাল কালিতে একটা টান। পাশে ছোট করে লেখা একটা শব্দ, আর একটা সাল।
মাফ। হালখাতা ১৩৮৬।
মাফ। হালখাতা ১৩৯২।
মাফ। হালখাতা ১৪০১।
“প্রতি বৈশাখে হালখাতা হয়,” হাজী সাহেব বললেন। “পুরান খাতা বন্ধ, নতুন খাতা খোলা। মানুষ আসে, যার যা আছে শোধ দেয়, মিষ্টি খায়, দোয়া নেয়। আর যার হাতে কিছু নাই, যার বাপ মরসে, যার চাকরি গেসে, যার মাইয়ার অসুখ, তার নামে আমি লাল দাগ দেই।”
“সবার?”
“সবার না। যে শোধ দিতে পারে অথচ দেয় না, তার নামে দাগ দেই না। তারে বৈশাখে ধইরা বসাই, চা খাওয়াই, কই, মিয়া, মরার পরে কবরে এই খাতা লইয়া যাইতে চাও? সে শরমে শোধ দেয়।” তিনি হাসলেন। “আর যে পারে না, তারে চাপ দিলে কী পামু? তার শরম আর আমার গুনাহ। লাভ নাই।”
আমার ভেতরের পেশাদার মানুষটা জেগে উঠল। “কিন্তু চাচা, এভাবে ব্যবসা চলে?”
“ষাট বছর চলতাসে।” তিনি খাতাটা বন্ধ করলেন। “তোমাগো ব্যাংক কয় বৎসরের?”
আমাদের ব্যাংকের বয়স ছাব্বিশ বছর।
“বাকি জিনিসটা আসলে কী, জানো?” হাজী সাহেব চায়ের গ্লাসে চুমুক দিলেন। “বিশ্বাস। আমি তোমারে চাউল দিয়া টাকা নিলাম না, কারণ আমি তোমারে চিনি। তোমার বাপেরে চিনি, তোমার মায়েরে চিনি, তুমি কোন মসজিদে নামাজ পড়ো সেইটা চিনি। বাকি আছিল চিনাজানার আরেক নাম।” তিনি কাউন্টারে আঙুল ঠুকলেন। “আর তোমাগো ব্যাংকের বাকি? তোমাগো ব্যাংক রফিকরে চিনতো?”
আমি ফাইলের দিকে তাকালাম। রফিকুল করিমের একটা সিআইবি রিপোর্ট আছে, এনআইডির কপি আছে, দোকানের ট্রেড লাইসেন্স আছে। তার মেয়ের নাম নেই। সে কোন মসজিদে নামাজ পড়ত, নেই। মারা গেছে, সেটাও নেই।
“না, চাচা,” আমি বললাম। “চিনত না।”
“এই কারণেই মরার পরেও ফোন করে,” হাজী সাহেব বললেন। “চিনলে করতো না।”
দুই
রফিকের গল্পটা আমি শুনলাম সেই সন্ধ্যায়, আরো দুই গ্লাস চায়ের মাঝখানে।
রফিক বাপের দোকানে বসত, কিন্তু বাপের মতো দোকান চালাতে চাইতো না। চাইতো ফ্রিজ, কাচের শোকেস, প্যাকেটের জিনিস, সুপারশপের মতো। একদিন ব্যাংকের এক ছেলে এসে দোকানে বসে কার্ডের ফর্ম পূরণ করিয়ে নিয়ে গেল। কোনো জামানত লাগবে না, কোনো দৌড়াদৌড়ি না, দুই সপ্তাহে কার্ড বাসায়। প্রথমে ফ্রিজ এলো। তারপর মেয়ের স্কুলের ভর্তি। তারপর বউয়ের অপারেশন। তারপর মেয়ের বিয়ে।
“প্রতি মাসে খালি একটুখানি দিলেই হয়,” হাজী সাহেব বললেন। “রফিক তাই কইতো। আব্বা, পুরা টাকা দেওন লাগে না। খালি মিনিমাম দিলেই চলে।”
আমি চুপ করে রইলাম। কারণ “মিনিমাম” শব্দটার পেছনে কী আছে, আমি জানি। আমি ট্রেনিংয়ে শিখেছি।
ক্রেডিট কার্ডের বিলে একটা ছোট অঙ্ক থাকে, মিনিমাম পেমেন্ট। মোট বকেয়ার সামান্য একটা অংশ। ওটা দিলে কার্ড চালু থাকে, কেউ ফোন করে না, মনে হয় সব ঠিক আছে। কিন্তু বাকি টাকার ওপর সুদ জমতে থাকে, মাসে মাসে, সুদের ওপর সুদ। যে মানুষ শুধু মিনিমাম দেয়, সে বছরের পর বছর দিতে থাকে, আর আসল টাকাটা প্রায় নড়েই না। এই ব্যবস্থাটা কোনো দুর্ঘটনা না। ব্যবসাটা এর ওপরই দাঁড়িয়ে। কার্ড কোম্পানির সবচেয়ে লাভের গ্রাহক সে, যে কোনোদিন পুরো টাকা শোধ করতে পারে না, আবার কোনোদিন একেবারে থেমেও যায় না। আমেরিকার কার্ড ইন্ডাস্ট্রিতে নাকি আড়ালে একটা ঠাট্টা চলে। যে গ্রাহক প্রতি মাসে পুরো বিল সময়মতো শোধ করে দেয়, তাকে তারা বলে “ডেডবিট”, অকেজো খদ্দের। তার কাছ থেকে প্রায় কিছুই কামানো যায় না।
মানে যে মানুষ দেনা নিয়ে ঘুমায় না, এই ব্যবস্থার চোখে সে-ই ব্যর্থ।
হাজী সাহেবকে আমি এসব বললাম না। বলার দরকারও হলো না।
“আমি একদিন রফিকরে কইসিলাম,” তিনি বললেন, “বাপ, তোর দেনা কত? সে কইতে পারে নাই। আল্লার কসম, সে জানতো না। খালি জানতো মাসে কত দিতে হয়।” তিনি লাল খাতার দিকে তাকালেন। “এই খাতায় একটা মানুষেরও নাম নাই, যে জানে না সে কত বাকি। আমরা লেইখা রাখি, মুখে কই, বৈশাখে হিসাব করি। দেনা যেন চোখের সামনে থাকে। দেনা চোখের আড়ালে গেলেই মানুষ শেষ।”
“রফিক ভাই আপনার খাতা থেকে বাকি নিতেন?”
বৃদ্ধ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর এমন একটা কথা বললেন, যেটা আমি পরে বহু রাত মাথা থেকে সরাতে পারিনি।
“না। বাপের কাছে বাকি চাইতে শরম লাগে। ব্যাংকের কাছে লাগে না। ব্যাংকের তো মুখ নাই।” তিনি চশমাটা আবার চোখে দিলেন। “মানুষ সবচেয়ে বেশি ঠকে এমন মহাজনের কাছে, যার মুখ নাই। মুখ থাকলে শরম থাকে দুই পক্ষেরই। আমি রফিকের মুখ দেখলে বুঝতাম সে কষ্টে আছে, দেনা থামাইয়া দিতাম। ব্যাংক তার মুখ দেখে নাই। দেখসে একটা নাম্বার। নাম্বারের কষ্ট গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই।”
তিনি একটু থেমে বললেন, “জানো, নবীজির সামনে একবার একটা জানাজা আনা হইছিল। উনি জিগাইলেন, এর উপরে কোনো দেনা আছে? সাহাবিরা কইলেন, আছে। উনি জানাজা পড়লেন না। কইলেন, তোমরা পড়ো। তখন আবু কাতাদা কইলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এর দেনা আমি নিলাম। তারপর উনি জানাজা পড়াইলেন।”
হাজী সাহেবের গলা নেমে এলো। “আরেক হাদিসে আছে, আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হইলে সব গুনাহ মাফ। খালি দেনা ছাড়া। চিন্তা কইরা দেখো, শহীদের রক্তও দেনা ধুইতে পারে না। দেনা এত ভারী জিনিস।”
“তাহলে চাচা, আপনি মাফ করেন কেন? দেনা যদি এত ভারী হয়?”
“কারণ ভারীটা দেনাদারের উপরে। পাওনাদারের উপরে আছে আরেক হুকুম।” তিনি খাতার শেষ পাতায় সাঁটা একটা হলুদ কাগজ দেখালেন, হাতে লেখা একটা আয়াতের অনুবাদ। সূরা বাকারা, ২৮০। “যদি দেনাদার অভাবে থাকে, তাইলে সময় দাও। আর যদি মাফ কইরা দাও, তা তোমাগো জন্য আরো ভালো, যদি জানতা।” তিনি কাগজটায় হাত বুলালেন।
“দেনা নেওয়ার সময় ভয় রাখো। দেনা দেওয়ার সময় দয়া রাখো। দুইটা একসাথে থাকলে সমাজ চলে। তোমরা উল্টা কইরা ফালাইসো। নেওয়ার সময় কোনো ভয় নাই, এক ক্লিকে দেনা। আর আদায়ের সময় কোনো দয়া নাই, মরার পরেও ফোন।”
দোকানের ভেতরের দরজা খুলে একজন মহিলা এলেন। বয়স চল্লিশের মতো, মাথায় ঘোমটা, হাতে একটা স্মার্টফোন। কাউন্টারের এক কোনায় ছোট একটা টেবিল, তাতে একটা বিকাশ-নগদের সাইনবোর্ড। তিনি সেখানে বসলেন।
“আমার পুতের বউ,” হাজী সাহেব বললেন। “শিরিন।”
শিরিন আপা আমার হাতের ফাইলের দিকে তাকালেন। মুখটা শক্ত হয়ে গেল। “ব্যাংক থেইকা?”
“জি। আমি জানতাম না রফিক ভাই…”
“জানতেন না, জানি।” তিনি ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন। “গত চৌদ্দ মাসে আপনাগো ব্যাংক থেইকা একশো বাইশটা কল আইছে। একজন মরা মানুষরে। আমি গুইনা রাখছি।”
আমার কিছু বলার ছিল না।
কিন্তু তারপর শিরিন আপা এমন কিছু বললেন, যেটা আমি আশা করিনি। তিনি শ্বশুরের দিকে ফিরলেন। “আব্বা, আপনি আবার আপনার খাতার গল্প শুনাইতেছেন?” গলায় রাগ নেই, ক্লান্তি আছে। “সাহেব, আব্বার খাতা সুন্দর জিনিস। কিন্তু সত্য কথা কই? আব্বার খাতা এই এক গলিতে চলে। কারণ এই গলির সবাই সবাইরে চিনে। ঢাকা শহরে দুই কোটি মানুষ। কেউ কাউরে চিনে না। আমার মাইয়ার বিয়ার টাকা আব্বার খাতা থেইকা আসতো? আমার অপারেশনের টাকা? রফিক ব্যাংকে গেছিল কারণ ওর আর কোনো রাস্তা আছিল না তখন।”
হাজী সাহেব মাথা নিচু করলেন। তারপর বললেন, “খাতা চলে চিনাজানায়, শহর চিনাজানা খাইয়া ফালাইছে। পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ জানে না পাশে কে মরছে। এখন অচেনা মানুষরে বাকি দিবা ক্যামনে? তাই তারা বানাইছে স্কোর, রিপোর্ট, নাম্বার। চিনাজানার বদলে নজরদারি। বিশ্বাসের বদলে শিকল।”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “দোষ খালি ব্যাংকের না, বাবা। আগে আমরা প্রতিবেশী হারাইছি। তারপর ব্যাংক আইসা সেই খালি জায়গায় বসছে। আর এমন দামে বসছে, যেই দাম দিতে দিতে মানুষ বাইচা থাইকাও মরে।”
শিরিন আপা আর কিছু বললেন না। ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
উঠতে যাওয়ার আগে হাজী সাহেব আমাকে বললেন, “পুরান খাতাগুলা দেখবা? তুমি তো হিসাবের মানুষ।”
আমি কেন রাজি হয়েছিলাম, জানি না। হয়তো ফাইলটা নিয়ে অফিসে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছিল না। আমি হলুদ পাতাগুলো উল্টাতে লাগলাম। ১৩৭০, ১৩৮০, ১৩৯০। একেকটা পাতা একেকটা মহল্লার ইতিহাস। কে কবে চাকরি হারিয়েছিল, কার বাড়িতে কবে বিয়ে হয়েছিল, কোন বছর বন্যার পর পুরো পাতাজুড়ে শুধু লাল দাগ।
তারপর ১৪০০ সালের খাতা। আমি পাতা উল্টাচ্ছিলাম অভ্যাসে, চোখ বুলিয়ে। একটা নামে এসে আমার আঙুল থেমে গেল।
মোঃ নাসির উদ্দিন। আজিমপুর। চাউল, ডাল, দুধ, বাচ্চার সুজি। বাকি এক হাজার আটশো চল্লিশ টাকা।
আর নামের ওপর দিয়ে লাল টান। পাশে ছোট অক্ষরে:
মাফ। হালখাতা ১৪০১। লোকটা মারা গেছে। বউ আর তিন বছরের পোলা। খুঁজলে কইবা না।
আমার আব্বার নাম মোঃ নাসির উদ্দিন। আমরা তখন আজিমপুরে থাকতাম।
আমি কতক্ষণ খাতাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, জানি না। “বাচ্চার সুজি” শব্দ দুইটা থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। ওই বাচ্চাটা আমি।
“চাচা।” আমার গলা ভেঙে যাচ্ছিল। “এই মানুষটা… ইনি আমার আব্বা।”
হাজী সাহেব খাতার ওপর ঝুঁকলেন, চশমা ঠিক করলেন, নামটা পড়লেন। তারপর আমার মুখের দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ। যেভাবে প্রথমবার দরজায় তাকিয়েছিলেন।
“নাসির,” তিনি আস্তে বললেন। “লম্বা, চুপচাপ। বাম হাতে লেখতো। শেষ দিকে অনেক কাশতো।” তাঁর চোখ ভিজে উঠল। “তোমার মা আমারে খুঁজছিল, জানো? এক বৈশাখে মহল্লায় মহল্লায় জিগাইতেসিল, কোন দোকানে তার স্বামীর বাকি। আমি শুনসিলাম, সামনে যাই নাই।”
“কেন, চাচা? আম্মা ত্রিশ বছর ধরে খুঁজছেন।”
“কারণ মাফ কইরা কইতে নাই।” বৃদ্ধ খাতাটা বন্ধ করলেন। “কইলে মাফ আর মাফ থাকে না। এহসান হইয়া যায়। তোমার মা সারাজীবন আমার সামনে মাথা নিচু কইরা চলতো। একজন বিধবার মাথা নিচু করানোর চাইতে আঠারোশো চল্লিশ টাকা হারানো অনেক সস্তা।”
তিন
পরদিন অফিসে আমি রফিকুল করিমের ফাইলে মৃত্যুসনদ জুড়ে দিলাম, সাথে একটা আবেদন। বকেয়া মওকুফের। পরিবার অসচ্ছল, মৃত ব্যক্তির কোনো সম্পদ নেই একটা পুরনো মুদি দোকান ছাড়া।
আমার ম্যানেজার ফাইলটা দুই মিনিট দেখলেন। তারপর চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। “দোকানটা তো আছে। এস্টেট থেকে রিকভার করো। লিগ্যালে পাঠাও।”
“স্যার, ষাট বছরের দোকান। বাবা এখনো বেঁচে আছেন, ওটাই তাঁর…”
“শোনো।” তিনি ফাইলটা বন্ধ করলেন। গলায় কোনো নিষ্ঠুরতা ছিল না, শুধু ক্লান্তি। “এই টাকা ব্যাংকের না। আমানতকারীদের। ওদের মধ্যেও বিধবা আছে, পেনশনের টাকা রাখা বুড়া মানুষ আছে। আমি একজনকে মাফ করলে আরেকজনের টাকা দিয়ে করি। আমরা চ্যারিটি না।”
তিনি ভুল বলেননি। এটাই সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার ছিল। ব্যবস্থার ভেতরে বসে থাকা প্রত্যেকটা মানুষ ঠিক কথাই বলে। শুধু পুরো ব্যবস্থাটা মিলে একটা ভুল জিনিস বানায়।
সেই সন্ধ্যায় আমি আবার করিম স্টোরে গেলাম। খবরটা দিতে। হাজী সাহেব শুনলেন, মাথা নাড়লেন, যেন আগেই জানতেন।
“দোকান বেইচা দিমু,” তিনি শান্ত গলায় বললেন। “বৈশাখের পরে। হালখাতাটা কইরা লই, শেষবার।”
“চাচা!”
“পোলার কবরে দেনা রাখমু না।” তিনি লাল খাতাটায় হাত রাখলেন। “নবীজি দেনাদারের জানাজা পড়েন নাই। আমার রফিক কবরে শুইয়া শুইয়া একটা মুখ ছাড়া মহাজনের কাছে আটকা থাকবো, আর আমি এই দোকানে বইসা অন্য মানুষের দেনা মাফ করমু? এইটা কোন ইনসাফ?”
সেই রাতে আমি আম্মাকে সব বললাম। করিম স্টোর, লাল খাতা, আব্বার নাম, বাচ্চার সুজি, লাল দাগের পাশে লেখা ওই লাইন: খুঁজলে কইবা না।
আম্মা অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর উঠে গিয়ে আলমারি থেকে একটা পুরনো টিনের কৌটা নামালেন। ভেতরে ভাঁজ করা কিছু নোট, অনেক পুরনো, কিছু এখন আর চলেই না।
“প্রতি বৈশাখে এখানে কিছু রাখছি,” আম্মা বললেন। “ত্রিশ বছর ধইরা। ভাবসিলাম যেদিন দোকানটা পামু, সেইদিন দিমু।” তারপর আমার দিকে তাকালেন। “কিন্তু এইটুকু দিয়া কী হইবো? তিন লাখ টাকার দেনা।” আম্মা কৌটাটা বন্ধ করলেন। আর তারপর এমন একটা কথা বললেন, যেটা আমার মাথায় কোনোদিন আসত না।
“তুই না সারাদিন মানুষ খুঁইজা বাইর করস? যারা পলাইয়া থাকে, ফোন ধরে না, ঠিকানা বদলায়? ওই খাতায় যাগো নামে লাল দাগ, তাগো খুঁজ।”
পরের তিন সপ্তাহ আমি জীবনে প্রথমবার আমার পেশার বিদ্যা উল্টো দিকে খাটালাম।
এশার পর দোকানের কাউন্টারে বসে হাজী সাহেব পুরনো খাতাগুলো খুলতেন, আমি নামগুলো টুকে নিতাম, আর শিরিন আপা তার বিকাশের টেবিল থেকে মনে করিয়ে দিত কোন পরিবার এখন কোথায় থাকে। একেকটা লাল দাগ মানে একেকটা পরিবার। আমি চার বছর ধরে যে কৌশলে ডিফল্টারদের খুঁজি, পুরনো ঠিকানা, আত্মীয়ের নাম, মহল্লার মসজিদ, সেই একই কৌশলে খুঁজতে লাগলাম যাদের দেনা মাফ হয়েছিল। অনেকে মারা গেছেন। অনেকে বিদেশে। অনেকে এখনো লালবাগে, আশেপাশের গলিতে।
শিরিন আপা একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলল, নাম দিল “করিম স্টোরের খাতা”। আমি হাসলাম। শিরিন বলল, “হাসেন ক্যান? খাতা চলে চিনাজানায়। চিনাজানা এখন এইখানে থাকে।”
কাউকে টাকার অঙ্ক বলা হয়নি। কাউকে বলা হয়নি কে কত দেবে। শুধু বলা হয়েছিল, এ বছর পহেলা বৈশাখে করিম স্টোরে শেষ হালখাতা।
পহেলা বৈশাখ, ১৪৩৩। সকাল থেকে দোকানের সামনে লাল-সাদা কাগজের ফুল, কাউন্টারে বড় একটা গামলায় রসগোল্লা। হাজী সাহেব নতুন একটা লাল খাতা খুলে বসেছেন, পাশে একটা টিনের বাক্স। বাক্সের মুখে লেখা: যার যা ইচ্ছা।
প্রথম এলেন এক বৃদ্ধ, লাঠি হাতে। উনিশশো ঊনআশিতে কারখানা বন্ধ হয়ে তাঁর চাকরি গিয়েছিল, ছয় মাস এই দোকান থেকে বাকিতে খেয়েছিলেন। তিনি বাক্সে একটা খাম রাখলেন, হাজী সাহেবের হাত ধরে কাঁদলেন, একটা রসগোল্লা খেয়ে চলে গেলেন।
তারপর এক মাঝবয়সী মহিলা। আটাশির বন্যার পর তাঁর বাবার নামে পুরো এক পাতা লাল দাগ। এখন তিনি একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা।
তারপর এক ডাক্তার, ধানমন্ডি থেকে গাড়ি নিয়ে এসেছেন। গলির মুখে গাড়ি থামিয়ে হেঁটে এসেছেন। তাঁর মা এই দোকান থেকে বাকিতে সুজি কিনতেন, তাঁর জন্য।
তারপর আরও। সারাদিন। দুপুরে আজানের সময় একটু থামল, তারপর আবার। কেউ এক হাজার, কেউ পঞ্চাশ হাজার, কেউ পাঁচশো টাকা আর একটা কাগজে লেখা দোয়া। একটা ছেলে এলো, বিশ বছরের মতো, বলল তার দাদার নাম খাতায় আছে, দাদা মারা গেছেন, সে টিউশনির টাকা থেকে কিছু দিয়ে গেল।
মাগরিবের আগে আম্মা এলেন। সাদা শাড়ি, হাতে সেই টিনের কৌটা। হাজী সাহেব তাঁকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁরা দুজন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ত্রিশ বছরের খোঁজাখুঁজির পর।
আম্মা কৌটাটা বাক্সের পাশে রাখলেন। বললেন, “ভাইজান, এইটা এহসান না। শোধ।”
হাজী সাহেব কিছু বলতে পারলেন না। শুধু মাথা নাড়লেন, আর চশমা খুলে চোখ মুছলেন।
এশার পর আমরা টাকা গুনলাম। শিরিন আপা, আমি, আর মহল্লার দুইজন মুরুব্বি। তিন লাখ একষট্টি হাজার চারশো টাকা। রফিকের দেনার চেয়ে আঠারো হাজার বেশি।
হাজী সাহেব নতুন খাতার প্রথম পাতায় প্রথম লাইনটা লিখলেন দোয়াতের কলমে। এবার আর কোনো দেনার হিসাব না। লিখলেন,
পাওনা শোধ: পুরা মহল্লা। হালখাতা ১৪৩৩।
“আর বাড়তি আঠারো হাজার?” শিরিন আপা জিজ্ঞেস করল।
হাজী সাহেব খাতার দ্বিতীয় পাতাটা খুললেন। খালি পাতা। “এইটা থাকবো এইখানে। পরের যেই মানুষের হাতে কিছু থাকবো না, তার লাইগা।” তারপর তিনি সূরা বাকারার আরেকটা আয়াত পড়লেন, আস্তে, প্রায় নিজের মনে। “আল্লাহ সুদরে মিটাইয়া দেন, আর দানরে বাড়াইয়া দেন।” তিনি টিনের বাক্সটার দিকে তাকালেন। “বাড়াইয়া দেন। দেখলা? আঠারোশো চল্লিশ টাকা মাফ করসিলাম। ত্রিশ বছর পরে আল্লাহ দুইশো গুণ ফেরত পাঠাইছেন। কোন ব্যাংক এই সুদ দেয়?”
পরদিন সকালে আমি নিজে ব্রাঞ্চে গিয়ে রফিকুল করিমের পুরো বকেয়া জমা দিলাম। কাউন্টারের মেয়েটা রসিদ দিল, অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করল, হাসিমুখে বলল, “থ্যাংক ইউ, স্যার।”
চার।
হাজী আব্দুল করিম মারা গেলেন কোরবানির ঈদের কয়েক দিন পর। এশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছিলেন আর ওঠেননি। মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে তিনি লাল খাতাটা আমার হাতে দিয়েছিলেন। নতুনটা না, পুরনোটা, যেটায় আমার আব্বার নাম। বলেছিলেন, “তুমি হিসাবের মানুষ। এইটা রাখো।”
দোকান এখন চালান শিরিন আপা। নতুন খাতাও তার কাছে। দ্বিতীয় পাতায় এখন পর্যন্ত চারটা নাম উঠেছে।
আমি এখনো রিকভারি অফিসার। তবে অফিসে অনুরোধ করে হার্ডশিপ ডেস্কে বদলি নিয়েছি, যেখানে যারা সত্যিই পারছে না তাদের কিস্তি নতুন করে সাজানো হয়। প্রতিটা দরজায় যাওয়ার আগে এখন আমি নিজেকে একটা প্রশ্ন করি যেটা কোনো ফর্মে নেই: এই বাসাটায় কে কে আছে?
আমার নিজের দুইটা কার্ডের একটা কেটে ফেলেছি, আরেকটার দেনা ছয় মাসে শোধ করেছি। মিনিমাম না। পুরোটা। আমি এখন আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ভাষায় একজন অকেজো খদ্দের। আম্মা বলেন, এই প্রথম আমি রাতে ঠিকমতো ঘুমাই।
তবে খাতাটা নিয়ে একটা ব্যাপার আমি কাউকে বলিনি। শিরিন আপাকেও না। আম্মাকেও না।
গত মাসে এক রাতে আমি খাতাটা খুলেছিলাম, আব্বার পাতাটা দেখার জন্য। প্রায়ই দেখি। কিন্তু সেদিন খাতার একেবারে শেষ পাতায়, যেটা আমি জানি খালি ছিল, একটা নতুন লেখা। হাজী সাহেবের হাতের লেখা, দোয়াতের কালিতে। আঙুল ছোঁয়াতেই একটু লেপ্টে গেল, কালিটা তখনো ভেজা! লেখা ছিল,
ব্যাংক। বাকি: একটা পোলা। একটা দোকানের ষাট বছর। এক মহল্লার চিনাজানা।
তার নিচে লাল কালিতে কোনো টান ছাড়া লেখা,
মাফ নাই। হিসাব হাশরে।
আর একেবারে নিচে ছোট অক্ষরে একটা শব্দ আর একটা নাম। শব্দটা “সাক্ষী”, নামটা আমার।
আমি এখনো ঠিক করতে পারিনি, ওই খাতায় আমি আসলে কোন পক্ষের সাক্ষী হিসেবে সাইন করব...
হালখাতা।
না লেখা গল্প-২





