পিঁপড়ের লাইন

পিঁপড়ের লাইন

৪ জানুয়ারি, রবিবার

এই ডায়েরিটা আমাকে আম্মু কিনে দিয়েছে। বলেছে প্রতিদিন লিখতে হবে, তাহলে বাংলা রচনায় হাত ভালো হবে। ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় রচনায় আমি পেয়েছিলাম দশে ছয়। আম্মু বলেছে ছয় দিয়ে কোনো ভালো স্কুলে ক্লাস নাইনে চান্স পাওয়া যায় না।

আমার নাম রাইয়ান। বয়স এগারো। আমি ধানমন্ডির একটা স্কুলে ক্লাস সেভেনে উঠেছি। আজকে নতুন বছরের প্রথম দিন কোচিং শুরু হলো।

৬ জানুয়ারি, মঙ্গলবার

আমার রুটিন লিখে রাখি, কারণ আম্মু বলেছে রুটিন লিখলে মানুষ সিরিয়াস হয়।

সকাল সাতটায় স্কুল। দুপুর দুইটায় ছুটি। আড়াইটায় ম্যাথ কোচিং। পাঁচটায় ইংলিশ কোচিং, সপ্তাহে তিন দিন। বাকি দিন সায়েন্স। সাড়ে সাতটায় বাসায় আসি। আটটা থেকে এগারোটা হোমওয়ার্ক। শুক্রবার সকালে আরবি হুজুর আসেন, বিকালে মডেল টেস্ট।

আমাদের কোচিংয়ের একটা অ্যাপ আছে। প্রতিটা টেস্টের পর নম্বর ওঠে, আর সবার নামের পাশে একটা র‍্যাংক। আম্মুর ফোনে নোটিফিকেশন যায়। গত মাসে আমি ছিলাম তিন নম্বর। আম্মু খুশি হয়ে আমাকে একটা পিৎজা খাইয়েছে।

আমার বন্ধু তাহসিন ছিল এক নম্বর। তাহসিন এখন রাতে ঘুমের মধ্যে কথা বলে। ওর আম্মু আমার আম্মুকে বলেছে।

৯ জানুয়ারি, শুক্রবার

আজকে দাদু এসেছেন। দাদু রাজশাহীর একটা গ্রামে থাকতেন। একটা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন আটত্রিশ বছর। দাদি মারা যাওয়ার পর থেকে একা থাকেন। আব্বু অনেকদিন ধরে বলছিলেন ঢাকায় আসতে। এবার দাদু রাজি হয়েছেন তিন মাসের জন্য আসতে।

দাদু অনেক লম্বা। চুল সাদা, কিন্তু অনেকগুলো। চশমার একটা ডাঁটা সুতো দিয়ে বাঁধা। আর দাদুর একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। কেউ কিছু বললে উনি সাথে সাথে উত্তর দেন না। একটু চুপ করে থাকেন। প্রথমে ভেবেছিলাম উনি কানে কম শোনেন। পরে বুঝলাম, উনি আসলে ভাবেন।

আমাদের বাসায় দাদুর থাকার আলাদা ঘর নেই, তাই উনি আমার ঘরে থাকবেন। আমার খাটের পাশে একটা ফোল্ডিং খাট পাতা হয়েছে।

১০ জানুয়ারি, শনিবার

রাতে হোমওয়ার্ক করছিলাম। ম্যাথ, বীজগণিত, অনেকগুলো। দাদু খাটে বসে বসে আমাকে দেখছিলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “রাইয়ান, তুমি এখন কী শিখছ?”

আমি বললাম, “বীজগণিত। (a+b)² এর সূত্র।”

“এটা দিয়ে কী হয়?”

আমি একটু ভাবলাম। তারপর বললাম, “পরীক্ষায় আসে।”

দাদু কিছু বললেন না। আবার চুপ করে রইলেন।

১৩ জানুয়ারি, মঙ্গলবার

আজকে কোচিং থেকে ফিরে দেখি দাদু বারান্দায় বসে আছেন, হাতে একটা কাগজ। উনি আমার এই সপ্তাহের রুটিনটা নিজের হাতে লিখে নিয়েছেন। আমাকে দেখালেন।

“তোমার দিনে খেলার সময় কোথায়?”

আমি কাগজটা দেখলাম। আসলে খেলার সময় নেই। আমি আগে কখনো খেয়াল করিনি, কারণ আমার সব বন্ধুর রুটিনও এরকম।

দাদু বললেন, “আমি আটত্রিশ বছর বাচ্চা পড়িয়েছি। আমার স্কুলের বাচ্চারা সকালে স্কুলে আসত, দুপুরে বাড়ি গিয়ে বাবার সাথে খেতে যেত, বিকালে নদীতে সাঁতার কাটত, মাগরিবের পর হারিকেনের আলোয় পড়ত। অনেকে পরীক্ষায় খারাপ করত। কিন্তু কেউ রাতে ঘুমের মধ্যে কথা বলত না।”

আমি দাদুকে তাহসিনের কথা বলিনি। দাদু কীভাবে জানলেন, জানি না। হয়তো আম্মু বলেছে।

১৬ জানুয়ারি, শুক্রবার

আজকে মডেল টেস্টের পর দাদু আমাকে একটা প্রশ্ন করলেন। অদ্ভুত প্রশ্ন।

“তুমি কী জানতে চাও?”

আমি বুঝলাম না। বললাম, “মানে, কোন সাবজেক্ট?”

“না। সাবজেক্ট না। তুমি নিজে, রাইয়ান, কোন জিনিসটা জানতে চাও? এমন কিছু, যেটা কেউ তোমাকে পড়তে বলেনি, পরীক্ষায় আসবে না, কিন্তু তুমি জানতে চাও।”

আমি অনেকক্ষণ ভাবলাম। মাথায় কিছু এলো না। এটা খুব অদ্ভুত লাগল। আমি তো সবসময় কিছু না কিছু শিখি। কিন্তু নিজে কী জানতে চাই, এটা কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি। আমি নিজেও না।

দাদু বললেন, “ঠিক আছে। ভাবো। যেদিন মনে আসবে, আমাকে বলবে।”

২১ জানুয়ারি, বুধবার

স্কুলের সিঁড়িতে বসে টিফিন খাচ্ছিলাম। দেখলাম একটা লম্বা লাইন। পিঁপড়ার। একটা ফাটল থেকে বেরিয়ে দেয়াল বেয়ে উঠে কোথায় যেন যাচ্ছে। একটার পেছনে আরেকটা একদম সোজা। কেউ ধাক্কাধাক্কি করছে না, কেউ লাইন ভাঙছে না। আমি একটা আঙুল দিয়ে লাইনের মাঝখানে ঘষে দিলাম। পিঁপড়াগুলো থেমে গেল। এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার নতুন করে লাইন বানিয়ে ফেলল।

আমি টিফিনের ঘণ্টা শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে দেখলাম। ক্লাসে দেরি হলো তাই মিস বকা দিলেন।

বাসায় এসে দাদুকে বললাম, “দাদু, আমি জানতে চাই পিঁপড়া লাইন ধরে হাঁটে কেন। আর আমি লাইনটা মুছে দিলে ওরা আবার রাস্তা খুঁজে পায় কীভাবে।”

দাদু এই প্রথম আমার কথার সাথে সাথে উত্তর দিলেন কোনো চুপ থাকা ছাড়াই।

উনি হাসলেন। বললেন, “এই তো শুরু হলো।”

ফেব্রুয়ারি

২ ফেব্রুয়ারি, সোমবার

দাদু আর আম্মুর মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছে। আমি দরজার পাশ থেকে শুনেছি।

দাদু চেয়েছিলেন শুক্রবার বিকালের মডেল টেস্টটা বাদ দিতে। আম্মু রাজি হননি। শেষে ঠিক হলো, মাগরিবের পর থেকে হোমওয়ার্ক শুরুর আগে আধঘণ্টা আমি দাদুর। ওই আধঘণ্টায় কোনো বই না, কোনো খাতা না। আম্মু বললেন, “ঠিক আছে আব্বা। কিন্তু রেজাল্ট খারাপ হলে কিন্তু বন্ধ করতে হবে।”

আমি এটার নাম দিয়েছি দাদুর আধঘণ্টা।

৩ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার

প্রথম দাদুর আধঘণ্টা। আমি ভেবেছিলাম দাদু আমাকে পিঁপড়ার উত্তর বলে দেবেন। দেননি। বললেন, “আমি বললে তুমি একটা উত্তর জানবে। নিজে খুঁজলে তুমি খোঁজা শিখবে। কোনটা বেশি কাজের?”

আমরা ছাদে গেলাম। দাদু রান্নাঘর থেকে এক চিমটি চিনি নিয়ে এসেছিলেন। ছাদের কোনায় একটা পিঁপড়ার গর্ত আছে, দাদু আগেই খুঁজে রেখেছিলেন। গর্ত থেকে একটু দূরে চিনিটা রাখলেন। তারপর আমরা দুজন বসে রইলাম। কোনো কথা না।

অনেকক্ষণ কিছুই হলো না। তারপর একটা পিঁপড়া এলো, একা, এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে। চিনিটা পেল। একটা দানা নিল। তারপর সোজা গর্তের দিকে ফিরে গেল। কয়েক মিনিট পর গর্ত থেকে অনেকগুলো পিঁপড়া বেরোল। আর ওরা সবাই ঠিক ওই প্রথম পিঁপড়াটা যে রাস্তায় ফিরে গিয়েছিল, সেই রাস্তা ধরেই চিনির দিকে এলো। আঁকাবাঁকা রাস্তা, কিন্তু সবাই একই আঁকাবাঁকা।

আমি বললাম, “দাদু, প্রথমটা কিছু একটা রেখে গেছে রাস্তায়!”

দাদু শুধু মাথা নাড়লেন। আধঘণ্টা শেষ।

৫ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার

আজকে দাদু আর আমি একসাথে আব্বুর ফোনে উত্তর খুঁজলাম। দাদু বললেন, “এখন বই দেখার সময়। নিজে দেখার পরে বই দেখলে বই তোমার সাথে কথা বলে। আর নিজে চিন্তা করার আগে বই দেখলে তুমি বইয়ের কথা বলো।”

আমি ঠিকই ধরেছিলাম। পিঁপড়া হাঁটার সময় নিজের শরীর থেকে একটা রাসায়নিক জিনিস রেখে যায়। একটা গন্ধের মতো। বাকি পিঁপড়ারা ওটা শুঁকে শুঁকে রাস্তা চেনে। খাবার পেলে ফেরার পথে বেশি করে রেখে যায়, তাই রাস্তা আরও শক্ত হয়। আর আমি আঙুল দিয়ে ঘষে দিয়েছিলাম বলে গন্ধটা মুছে গিয়েছিল। তাই ওরা হারিয়ে গিয়েছিল। তারপর আবার খুঁজে নতুন গন্ধের রাস্তা বানিয়েছিল।

আমি এতটা খুশি জীবনে কোনো পরীক্ষায় হইনি। এমনকি তিন নম্বর হওয়ার দিনও না।

৬ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার

আজকে হুজুর আসার আগে দাদু জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি জানো কোরআনে একটা সূরা আছে যার নাম পিঁপড়া?”

আমি জানতাম না। সূরা আন-নামল। নামল মানে পিঁপড়া। দাদু বললেন, ওই সূরায় একটা ঘটনা আছে। সুলাইমান আলাইহিস সালাম তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা উপত্যকায় পৌঁছালে একটা পিঁপড়া চিৎকার করে বলল, হে পিঁপড়ারা, তোমরা ঘরে ঢুকে যাও, যাতে সুলাইমান আর তাঁর বাহিনী না বুঝেই তোমাদের পিষে না ফেলে।

“একটা পিঁপড়া,” দাদু বললেন, “বাকি সবাইকে খবর দিল। তুমি ছাদে যা দেখলে, ঠিক সেটাই। একজন কিছু জানল আর সবাইকে জানিয়ে দিল।”

আর তারপর সুলাইমান আলাইহিস সালাম পিঁপড়ার কথা শুনে হেসেছিলেন। তারপর আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন তিনি শুকরিয়া আদায় করতে পারেন।

আমি হুজুরকে বললাম, এই সূরাটা আমি মুখস্থ করতে চাই। হুজুর অবাক হলেন। বললেন, “এটা তো অনেক বড় সূরা, বাবা।” আমি বললাম, তাহলে শুধু ওই পিঁপড়ার আয়াতগুলো করি? হুজুর হেসে সম্মতি দিলে।

আজকে প্রথমবার হুজুরের ক্লাসে আমার ঘুম পায়নি!

১১ ফেব্রুয়ারি, বুধবার

নতুন প্রশ্ন পেয়েছি। আজকে কোচিং থেকে ফেরার পথে রিকশায় দেখলাম রাস্তার পাশে একটা মরা কাঁক পড়ে আছে। আর তার চারপাশে ইলেকট্রিকের তারে, গাছে, দেয়ালে কম করে বিশ-পঁচিশটা কাক বসে চিৎকার করছে। একসাথে। ভয় পাওয়ার মতো শব্দ।

দাদুর আধঘণ্টায় দাদুকে ব্যাপারটা বললাম। দাদু জিগ্যেস করলেন, “তুমি কী মনে করো?”

আমি বললাম, “ওরা দুঃখ পাচ্ছে? নাকি জানাজা পড়ছে?”

দাদু হাসলেন না। বললেন, “হতে পারে। আর কী হতে পারে?”

আমি অনেক ভাবলাম। তারপর বললাম, “ওরা দেখছে কাকটা কীভাবে মরল? যাতে নিজেরা সাবধান হতে পারে?”

পরে আমরা খুঁজে দেখলাম। আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী এটা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। কাকেরা মরা কাক দেখলে সত্যিই জড়ো হয়ে চিৎকার করে। আর তারা মনে রাখে ওই জায়গাটা, আর আশেপাশে কোন মানুষ ছিল। পরে ওই জায়গা এড়িয়ে চলে। মানে আমার দ্বিতীয় উত্তরটা ঠিক। প্রথমটা ঠিক কিনা কেউ জানে না। দাদু বললেন, “কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ এখনো জানে না। এটা জানাও একটা জানা।”

১৪ ফেব্রুয়ারি, শনিবার

আজকে দাদুকে একটা প্রশ্ন করলাম যেটা অনেকদিন ধরে মাথায় ছিল। “দাদু, আপনার সময়ের স্কুল কি সব ভালো ছিল?”

দাদু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। এতক্ষণ, যে আমি ভাবলাম উনি শোনেননি। তারপর বাঁ হাতটা আমার দিকে বাড়ালেন, তালু ওপরে। তালুর মাঝখানে একটা পুরনো দাগ, সাদাটে, লম্বা।

“আমার মাস্টারের বেতের দাগ। ক্লাস থ্রিতে নামতা ভুল বলেছিলাম।”

আমি দাগটা ছুঁয়ে দেখলাম। শক্ত।

“আর আমি নিজেও বেত মেরেছি, রাইয়ান।” দাদুর গলা খুব আস্তে হয়ে গেল। “আমার প্রথম দশ-বারো বছর। তখন সবাই মারত, ভাবত এটাই নিয়ম। হাবিব নামে একটা ছেলে ছিল। খুব চঞ্চল, কিন্তু খুব বুদ্ধি। একদিন হোমওয়ার্ক আনেনি, আমি সবার সামনে ওকে মেরেছিলাম। পরের দিন থেকে ও আর স্কুলে আসেনি। কোনোদিন না। পরে শুনেছিলাম ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিল চোদ্দ বছর বয়সে।” দাদু চশমা খুলে চোখ মুছলেন। “আমি এখনো প্রতি রাতে ওর জন্য দোয়া করি।”

আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না।

“তাই আমাদের সময় সব ভালো ছিল তা না,” দাদু বললেন। “বেত ছিল, ভয় ছিল, অনেক বাচ্চা ঝরে যেত। কিন্তু একটা জিনিস ছিল যেটা এখন নেই। আমি আমার প্রতিটা ছাত্রের বাবার নাম জানতাম। কার বাড়িতে সেই সপ্তাহে চাল নেই, জানতাম। কে কেন পড়ায় মন দিতে পারছে না, জানতাম।” দাদু আমার দিকে তাকালেন। “তোমার কোচিংয়ের স্যার তোমার নাম জানেন?”

আমি ভাবলাম। ম্যাথ স্যার আমাকে ডাকেন “রোল সাতাশ” বলে। ইংলিশ স্যার কিছুই ডাকেন না, শুধু আঙুল দেখান।

আমি দাদুকে বললাম, “আমার রোল নম্বর জানেন।”

১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার

আজকে মাসিক টেস্টের রেজাল্ট দিয়েছে। আমি এগারো নম্বর।

আম্মুর ফোনে নোটিফিকেশন গেছে অফিসে থাকতেই। বাসায় ফিরে আম্মু আমার সাথে একটাও কথা বলেননি। রাতে খাওয়ার টেবিলে আম্মু দাদুকে বললেন। আমি আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু সব শুনেছি।

“আব্বা, আমি আপনাকে বলেছিলাম।”

দাদু কিছু বললেন না।

“আপনার স্কুলের বাচ্চারা ফেল করলে বাবার সাথে জমিতে যেত। তাদের বাবার জমি ছিল। আমার ছেলের বাবার কোনো জমি নেই, আব্বা। এই শহরে ভালো স্কুল মানে ভালো কলেজ, ভালো কলেজ মানে ভালো ভার্সিটি, ভালো ভার্সিটি মানে ভালো চাকরি। এক নম্বর কম পেলে দুইশো জনের পেছনে পড়ে যায়। আর পেছনে পড়লে এই শহর কেউ কাউকে হাত ধরে তোলে না।”

আম্মুর গলা কাঁপছিল। “আমি আপনার বিরুদ্ধে না, আব্বা। আমি ভয় পাই।”

আব্বু কিছু বললেন না। আব্বু সবসময়ই চুপ করে থাকেন।

দাদুও অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর শুধু বললেন, “জানি, মা। তোমাদের ভয়টা আমি বুঝি।”

আমি ভেবেছিলাম আজকে থেকে দাদুর আধঘণ্টা বন্ধ। আম্মু কিছু বলেননি। কিন্তু আজকে আধঘণ্টা হয়নি।

২০ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার

আজকে একটা অদ্ভুত জিনিস হলো।

মডেল টেস্টের আগে দাদু আমার ম্যাথ খাতাটা চাইলেন। তারপর মেঝেতে বসে একটা পুরনো বিস্কুটের প্যাকেটের কার্ডবোর্ড কেটে চারকোনা টুকরা বানালেন। একটা বড় বর্গ, একটা ছোট বর্গ, আর দুইটা লম্বা আয়তক্ষেত্র।

“বড়টার এক পাশ a। ছোটটার এক পাশ b। এবার চারটা মিলিয়ে একটা বড় বর্গ বানাও।”

আমি অনেকক্ষণ ধরে টুকরাগুলো এদিক-ওদিক করলাম। তারপর হঠাৎ মিলে গেল। একটা বড় বর্গ, যার প্রতিটা পাশ a আর b মিলিয়ে।

দাদু বললেন, “এই বড় বর্গটার ক্ষেত্রফল কত?”

(a+b)²।

“আর ভেতরের চারটা টুকরা আলাদা আলাদা যোগ করলে?”

আমি গুনলাম। a² আর b² আর দুইটা ab।

আমি চিৎকার করে উঠলাম। আম্মু রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলেন, ভেবেছেন আমি ব্যথা পেয়েছি। আমি আম্মুকে টুকরাগুলো দেখালাম। বললাম, “আম্মু, এই সূত্রটা আমি দুই বছর ধরে মুখস্থ করছি। আজকে প্রথম দেখলাম এটা আসলে কী।”

আম্মু মেঝেতে টুকরাগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর দাদুর দিকে। কিছু বললেন না। রান্নাঘরে ফিরে গেলেন।

কিন্তু রাতে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে, আম্মু আমার ঘরে এসে দাদুকে বললেন, “আব্বা, কাল থেকে আধঘণ্টা আবার শুরু করবেন।”

মার্চ

৩ মার্চ, মঙ্গলবার

বাংলা মিস হোমওয়ার্ক দিয়েছেন। রচনা: আমার জীবনের লক্ষ্য। দুইশো শব্দ।

ক্লাসে সবাই জানে এটা কীভাবে লিখতে হয়। গাইড বইয়ে আছে। “আমার জীবনের লক্ষ্য একজন ডাক্তার হওয়া। আমাদের দেশের গ্রামে গরিব মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়…” তারপর তিনটা প্যারা, তারপর উপসংহার। তাহসিন বলেছে ওর বড় আপু এই রচনা লিখে ক্লাস সেভেনে দশে নয় পেয়েছিল, হুবহু লিখতে হয়েছিল।

আমি দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম, ডাক্তার লিখব নাকি ইঞ্জিনিয়ার।

দাদু বললেন, “তুমি কী হতে চাও?”

আমি বললাম, জানি না।

দাদু বললেন, “তাহলে সেটাই লেখো।”

৪ মার্চ, বুধবার

কাল রাতে অনেকক্ষণ জেগে রচনাটা লিখেছি। দাদু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

আমি নিজে নিজে লিখেছি। ডায়েরিতে তুলে রাখি, কারণ এটা আমার লেখা প্রথম রচনা যেটা কোনো বই থেকে না।

আমার জীবনের লক্ষ্য।

আমি এখনো জানি না আমি বড় হয়ে কী হব। কিন্তু আমি জানি আমি কী করতে চাই। আমি প্রশ্ন খুঁজতে চাই। এই বছর আমি জেনেছি পিঁপড়া কেন লাইন ধরে হাঁটে। ওরা রাস্তায় গন্ধ রেখে যায়। আমি জেনেছি কাক কেন মরা কাকের চারপাশে চিৎকার করে। ওরা শেখে কোথায় বিপদ। আমি জেনেছি (a+b)² আসলে একটা বর্গ, যেটার ভেতরে চারটা টুকরা আছে। এগুলো আমি নিজে খুঁজে পেয়েছি, আমার দাদুর সাথে।

কোরআনের প্রথম শব্দ হলো ইকরা, মানে পড়ো। আল্লাহ বলেছেন, তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানত না। আমার মনে হয় এর মানে হলো, জানার কোনো শেষ নেই। তাই আমার জীবনের লক্ষ্য হলো প্রতিদিন একটা নতুন প্রশ্ন খুঁজে পাওয়া, আর তারপর সেটার উত্তর খোঁজা। ডাক্তার হলে রোগের প্রশ্ন খুঁজব। ইঞ্জিনিয়ার হলে মেশিনের প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন খোঁজা বন্ধ করব না।

১০ মার্চ, মঙ্গলবার

রচনার খাতা ফেরত দিয়েছে। দশে চার।

লাল কালিতে লেখা: “রচনার নির্দিষ্ট কাঠামো আছে। ভূমিকা, বিষয়বস্তু, উপসংহার। গাইড বই অনুসরণ করো।”

তাহসিন পেয়েছে দশে নয়। ওর রচনা হুবহু ওর আপুর রচনা।

আমি খাতাটা ব্যাগের একদম নিচে লুকিয়ে রেখেছি। আম্মুকে দেখাইনি। দাদুকেও না।

১১ মার্চ, বুধবার

দাদু জানতে পেরেছেন। আমি দাদুকে বলিনি। আমার মুখ দেখে বুঝেছেন, অথবা আমি রাতে ঘুমের মধ্যে কিছু বলেছি, জানি না।

আমি খাতাটা দেখালাম। দাদু লাল লেখাটা অনেকক্ষণ পড়লেন। তারপর পুরো রচনাটা পড়লেন। দুইবার।

তারপর দাদু একটা কথা বললেন যেটা আমি পুরোপুরি বুঝিনি, কিন্তু লিখে রাখছি, কারণ মনে হচ্ছে একদিন বুঝব।

“ইংল্যান্ডে গুডহার্ট নামে একজন অর্থনীতিবিদ ছিলেন। তাঁর নামে একটা নিয়ম আছে। কোনো কিছু মাপার জন্য আমরা একটা মাপকাঠি বানাই। কিন্তু যখন সেই মাপকাঠিটাই লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন সেটা আর ঠিকমতো মাপতে পারে না।” দাদু খাতাটার দিকে আঙুল রাখলেন। “নম্বর দিয়ে মাপার কথা ছিল তুমি কতটা ভাবতে শিখেছ। কিন্তু এখন নম্বরটাই লক্ষ্য। তাই তাহসিন নয় পেয়েছে না ভেবে, আর তুমি চার পেয়েছ ভেবে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে আমি কি ভুল করেছি?”

দাদু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “না। কিন্তু তোমাকে দুইটাই শিখতে হবে, রাইয়ান। নিজে ভাবতে, আর ওদের কাঠামোটাও জানতে। কারণ তুমি এই দুনিয়াতেই থাকবে, আমার গ্রামে না। কাঠামো শেখো, কিন্তু কাঠামোকে নিজের মাথাটা দিয়ে দিও না।”

১২ মার্চ, বৃহস্পতিবার

আম্মু খাতাটা খুঁজে পেয়েছেন। ব্যাগ গোছাতে গিয়ে।

আমি ভেবেছিলাম আম্মু রাগ করবেন। আম্মু রাগ করেননি। খাতাটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে রচনাটা পড়লেন। আমি দরজার আড়াল থেকে দেখছিলাম। আম্মু অনেকক্ষণ পড়লেন, দুইশো শব্দের জন্য অনেক বেশি সময়।

তারপর আম্মু উঠে নিজের আলমারি খুললেন। অনেক নিচ থেকে একটা পুরনো খাতা বের করলেন। মলাট হলুদ, কোনায় পানির দাগ। আমাকে ডাকলেন।

খাতার ওপরে লেখা, আম্মুর নাম, ক্লাস সেভেন। ভেতরে একটা রচনা। আমার জীবনের লক্ষ্য।

“আমি জ্যোতির্বিজ্ঞানী হতে চাই। আমাদের গ্রামে রাতে অনেক তারা দেখা যায়। আমি জানতে চাই তারারা কেন মিটমিট করে…”

পাশে লাল কালিতে নম্বর। দশে তিন। আর লেখা: “বাস্তবসম্মত লক্ষ্য লেখো।”

আম্মু বললেন, “পরের বছর আমি ডাক্তার লিখেছিলাম। দশে নয় পেয়েছিলাম।” আম্মু হাসলেন, কিন্তু চোখে পানি। আম্মু এখন একটা সরকারি চাকরি করেন। ডাক্তার হননি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীও না।

আম্মু আমার খাতা আর নিজের খাতা পাশাপাশি রাখলেন। তারপর বললেন, “বৃহস্পতিবারের সায়েন্স কোচিংটা বাদ দিচ্ছি। সায়েন্স দাদুর সাথে পড়বি।”

তারপর একটু থেমে বললেন, “কিন্তু ফাইনালে র‍্যাংক দশের বাইরে গেলে আবার ভর্তি করাব। মনে রাখিস।”

আম্মু এখনো ভয় পান। আমি বুঝি। কিন্তু আজকে আম্মু একটু কম ভয় পেয়েছেন। আমি সেটাও বুঝি।

১৮ মার্চ, বুধবার

আজকে দাদুর আধঘণ্টায় আমি দাদুকে একটা প্রশ্ন করলাম, যেটা আমার না, দাদুর।

“দাদু, হাবিব এখন কোথায়?”

দাদু অবাক হয়ে তাকালেন। বললেন, জানেন না। চল্লিশ বছর আগের কথা।

আমি বললাম, “খুঁজি?”

আব্বুর ফোনে দাদুর গ্রামের নাম দিয়ে ফেসবুকে একটা গ্রুপ পেলাম। গ্রামের মানুষেরা পুরনো ছবি দেয়, কে মারা গেল সেই খবর দেয়, ঈদে শুভেচ্ছা দেয়। দাদুর স্কুলের পুরনো ছবিও আছে, সাদা-কালো, সামনে দাদু দাঁড়িয়ে, অনেক কম বয়সে, চুল কালো। আমি একটা পোস্ট লিখলাম, দাদুর নাম দিয়ে। দাদু জানতে চান তাঁর পুরনো ছাত্র হাবিব এখন কেমন আছেন।

২৩ মার্চ, সোমবার

উত্তর এসেছে।

হাবিব আংকেল এখন মিরপুরে থাকেন। একটা দর্জির দোকান আছে, নিজের। আজকে সন্ধ্যায় উনি ফোন করলেন। দাদু ফোনটা ধরে বারান্দায় চলে গেলেন। আমি জানালা দিয়ে দেখছিলাম। দাদু অনেকক্ষণ কিছু বললেন না, শুধু শুনলেন। তারপর দাদুর কাঁধ কাঁপতে লাগল।

পরে দাদু আমাকে বলেছেন হাবিব আংকেল কী বলেছেন। আমি হুবহু লিখে রাখছি।

“স্যার, আপনি আমারে মারছিলেন, মনে আছে। কিন্তু আপনিই আমারে নামতা শিখাইছিলেন। দোকানের হিসাব আমি আজও আপনার নামতা দিয়া করি।” তারপর বলেছেন, “আমার মেয়ে এখন ক্লাস এইটে পড়ে, স্যার। ক্লাসে ফার্স্ট। আমি জীবনে কোনোদিন ওর গায়ে হাত তুলি নাই।”

দাদু বললেন, ওই শেষ কথাটা শুনে উনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি।

৩০ মার্চ, সোমবার

দাদু আজকে রাজশাহী ফিরে গেলেন।

যাওয়ার আগে আমাকে একটা ছোট নোটবুক দিয়েছেন। নীল মলাট। প্রথম পাতায় দাদুর হাতে লেখা একটা মাত্র শব্দ: প্রশ্ন। বাকি সব পাতা খালি। দাদু বললেন, প্রতি সপ্তাহে একটা প্রশ্ন লিখতে, আর ফোনে দাদুকে বলতে। উত্তর খুঁজে পেলে সেটাও।

ফোল্ডিং খাটটা আব্বু ভাঁজ করে রেখে দিয়েছেন। ঘরটা হঠাৎ অনেক বড় লাগছে।

৩ এপ্রিল, শুক্রবার

আজকে মডেল টেস্ট ছিল না। আম্মু গত সপ্তাহে কোচিংয়ে ফোন করে শুক্রবারটা বাদ দিয়েছেন। কাউকে কিছু বলেননি, শুধু আমাকে কাল রাতে বললেন, “কাল বিকালে ছাদে যাবি আমার সাথে?”

আমরা মাগরিবের পর ছাদে গেলাম। ঢাকায় বেশি তারা দেখা যায় না। কিন্তু কয়েকটা দেখা যায়। আম্মু অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক সেই প্রশ্নটা, যেটা আম্মু ক্লাস সেভেনে লিখেছিলেন।

“রাইয়ান, তারারা মিটমিট করে কেন?”

আমি জানি না।

আমি দাদুর মতো চুপ করে রইলাম। ভাবছিলাম।

আম্মুও চুপ করে রইলেন। আমার পাশে, ছাদের রেলিংয়ে হাত রেখে। মনে হলো আম্মু উত্তরের জন্য তাড়া দিচ্ছেন না। মনে হলো আম্মুও ভাবছেন।

নীল নোটবুকের দ্বিতীয় পাতায় আজকে প্রথম প্রশ্নটা লিখেছি। আমার না। আম্মুর।

পিঁপড়ের লাইন।

না লেখা গল্প-০৩

১৯-১০-২০২৬

Share This Post

Related Blog

অস্পৃশ্য

অস্পৃশ্য

সকালের নাশতার টেবিলে গরম চায়ের কাপটা ধরতে গিয়ে আমি ব্যাপারটা প্রথম টের পেলাম। কেন যেন ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ডগায় কোন অনুভূতি নেই। কাপটা হাত ...
কাঁঠালতলা

কাঁঠালতলা

আইসিইউরাত তিনটা পঁয়তাল্লিশ।ছয় নম্বর বেডের বৃদ্ধ হুট করে চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলেন, “আযান হইসে?”প্রশ্নটা শুনে শাহেদের হাত এমনভাবে কেঁপে উঠল যে স্যালাইনে...