সকালের নাশতার টেবিলে গরম চায়ের কাপটা ধরতে গিয়ে আমি ব্যাপারটা প্রথম টের পেলাম। কেন যেন ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ডগায় কোন অনুভূতি নেই।
কাপটা হাত থেকে পড়ে গেল তা না। তার মানে প্যারালাইসিস না। শুধু আমি স্পর্শ করে বুঝতে পারছি না ওটা চিনামাটির কাপ নাকি প্লাস্টিকের বোতল।
ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত অনুভব করলাম মেরুদণ্ডে। চোখের সামনে যা পেলাম তা-ই ছুঁয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করলাম।
তোয়ালে ধরলে মনে হচ্ছে কাঁচ ধরছি, আবার জিন্সের প্যান্টে হাত বুলালে মনে হচ্ছে তেলতেলে পলিথিন। সবকিছুই কেমন যেন একরকম, মসৃণ আর অর্থহীন...
সন্ধ্যায় নিউরোলজিস্টের চেম্বারে রিপোর্ট নিয়ে বসে আছি, সকালেই এসেছিলাম, পরামর্শ অনুযায়ী এমআরআই করলাম, নার্ভ কন্ডাকশন টেস্ট করলাম। টেস্টটা বেশ অদ্ভুত, হাতে সুঁই ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে ইলেকট্রিক পালস চেক করে নার্ভের, অনেকদিন পর এত ব্যথা সহ্য করা লাগলও।
তাও যদি কিছু ধরা পড়ত, রিপোর্ট নিজে নিজে পড়ে যা বুঝছি সব নরমালই এসেছে!
ডাক্তার রিপোর্টগুলো টেবিলে রেখে ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনি করেন কী?”
“কমার্শিয়াল রিটাচিং। মানে হাই এন্ডের বিজ্ঞাপন ফ্রেম ধরে ধরে পলিশ করি। মানুষের মুখের ব্রণ, বয়সের ভাঁজ, কাপড়ের কুঁচকে থাকা দাগ বা গয়নার গায়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আঁচড় মুছে নিখুঁত বানানোই আমার কাজ।” একটু গর্ব করার ভঙ্গিতেই বলে ফেললাম মনে হলো!
ডাক্তার বললেন, “মাউস ব্যবহার করেন না?”
“না। আমাদের নিখুঁত কাজের জন্য মাউস খুব ধীরগতির। আমি কাজ করি অ্যাপলের বড় গ্লাস ট্র্যাকপ্যাডে আর টাচ-স্ক্রিন মনিটরে। দুই হাতের আঙুল দিয়ে সরাসরি কাঁচের ওপর জুম করি, আর তর্জনী ঘষে ঘষে ছবির দাগ মুছি। ট্র্যাকপ্যাডে আঙুলের চাপের ওপর নির্ভর করে ব্রাশ কতটুকু গাঢ় হবে।”
ডাক্তার হাসলেন। “তার মানে কাজের সময় ট্র্যাকপ্যাডের কাঁচ, আর কাজের বাইরে ফোনের কাঁচ। দিনে কত ঘণ্টা কাঁচ ঘষেন আঙুল দিয়ে?”
আমি হিসাব করে দেখলাম, অফিসের ওই ফ্রস্টেড গ্লাসের ট্র্যাকপ্যাড আর হাতের স্মার্টফোন মিলিয়ে দিনে অন্তত চৌদ্দ ঘণ্টা আমার আঙুলের ডগা শুধু একটা মসৃণ, ঠান্ডা কাঁচের তলের ওপর ঘষা খাচ্ছে!!
চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাসায় ফেরার পথে আমি প্রথম খেয়াল করলাম আমি আসলে গত পাঁচ বছরে কোনো খসখসে জিনিসই ধরেছি বলে মনে পড়ে না!
আসলে আমরা তো আমাদের চারপাশের পৃথিবীটাকে ঘষেমেজে একদম সমান করে ফেলেছি। ফার্নিচারের গায়ে ডুকো পেইন্টের নিখুঁত প্রলেপ, লেকার, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে সিন্থেটিক র্যাপ, এমনকি বইয়ের পাতা উল্টানোর বদলে কিন্ডলের কাঁচের স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াই।
ডাক্তারের শেষ কথাগুলো মনে পড়ল, "মানব মস্তিষ্কের ‘সোমাটোসেন্সরি কর্টেক্স’ মানে যে অংশটা স্পর্শের অনুভূতি তৈরি করে, তার টিকে থাকার মূল শর্তই হলো ঘর্ষণ। মানুষের আঙুলের ডগায় যে তিন হাজারের বেশি মেকানোরিসেপ্টর থাকে সেগুলো সবচেয়ে সচল থাকে উঁচু-নিচু বা অমসৃণ তলের ধাক্কায়। তল যত মসৃণ হবে, মস্তিষ্ক তত কম সিগন্যাল পাবে। আপনার ক্ষেত্রে হয়তো মস্তিষ্ক ধরেই নিচ্ছে, ওই আঙুলটার আর অনুভব করার দরকার নেই।"
বাসায় ফিরে মেজাজটা এত খারাপ লাগছিলো যে আমি ফোনটা বাসায় রেখেই নিচে নেমে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে শুরু করলাম। জেনেভা ক্যাম্পের পেছনের একটা পুরনো গলিতে নিজেকে আবিষ্কার করলাম কিছুক্ষণ পর। চারপাশে সারি সারি কাঠের দোকান আর পুরনো আসবাবপত্র মেরামতের কারখানা।
একটা দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে করে নাকে একটা ঘ্রাণ ধাক্কা দিলো। কাঁচা কাঠের গুঁড়ো আর তারপিনের ঘ্রাণ। মনে পড়ল ছোটবেলায় নানাবাড়িতে এই ঘ্রাণটা পেতাম নতুন তোলা ঘরে, হাঁটা থামিয়ে দোকানটার দিকে তাকালাম।
ভেতরে প্রায় পুরোটাই অন্ধকার। শুধু তারে ঝুলানো একটা একশো ওয়াটের হলুদ বাল্ব জ্বলছে। একজন বৃদ্ধ লোক মাটিতে বসে একটা পুরনো সেগুন কাঠের সিন্দুকের গায়ে বাটালি দিয়ে নকশা কাটছেন। কোনো মেশিন না, হাতুড়িও না। শুধু হাতের চাপে বাটালিটা কাঠের বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে, আর কোঁকড়ানো কাঠের ফালিগুলো মাটিতে পড়ছে।
আমার উপস্থিতি টের পেয়ে বৃদ্ধ লোকটা মাথা না তুলেই বললেন, “পলিশ করা লেকার করা মাল এইখানে পাওয়া যায় না। ফরমাইশ দিতে চাইলে সামনের গলিতে যান।”
আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। “না, আমি কিছু কিনতে আসিনি চাচা। দেখছিলাম এমনি।”
তিনি এবার মাথা তুললেন। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, একটা কাঁচ ফেটে গেছে, সুতা দিয়ে বাঁধা। হাত দুটো দেখে আমি থমকে গেলাম। আঙুলের গিটগুলো ফোলা, চামড়া এত মোটা আর খসখসে যে মনে হয় গাছের বাকল। মাঝের আঙুলে বাটালির দাগ বসে গিয়ে স্থায়ী গর্ত হয়ে গেছে।
অথচ সেই হাত দিয়েই তিনি যখন কাঠের ওপর হাত বোলাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিলো কোনো মা তার ঘুমন্ত বাচ্চার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
“দেখার জিনিস না বাপ,” তিনি আবার কাজে মন দিলেন। “কাঠ হইলো ছুঁইয়া বোঝার জিনিস। চোখ তো ধোঁকা দেয়। এই যে শহরের দোকানে প্লাস্টিকের গায়ে কাঠের ছবি ছাপাইয়া বেচে, চোখ তো দেইখা খুশি হইয়া যায়। কিন্তু হাত দিলে হাত ঠিকই কইয়া দেয় এর ভিতরে জান নাই।”
বৃদ্ধের কথার ধরণ বেশ অদ্ভুত, আকর্ষণীয়ও বটে! আমি দোকানের ভেতরে ঢুকে একটা কাঠের টুলের ওপর বসলাম অনুভূতিহীন হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে।
বললাম, “চাচা, এখন তো সিএনসি মেশিন বের হয়েছে। কম্পিউটারে ডিজাইন দিলে আধা ঘণ্টায় নিখুঁত নকশা কেটে দেয়। এত কষ্ট করে হাত দিয়ে কাটেন এখনো?”
বৃদ্ধ লোকটা বাটালিটা থামালেন। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“নিখুঁত জিনিস আল্লাহর দুনিয়ায় থাকে না, বাবা। মানুষের মুখ কি দুই পাশ সমান? গাছের দুইটা পাতা কি এক মাপের হয়? হয় না।
মেশিনে কাটা ফুল দেখলে মনে হয় কবরের ওপর রাখা প্লাস্টিকের ফুল। একদম সমান, কোনো ভুল নাই।
আর হাত দিয়া যখন কাটি, তখন ওই কাঠের গিঁটের লগে আমার হাতের একটা সওয়াল-জওয়াব হয়। কাঠটা যেইদিকে যাইতে চায়, বাটালি সেইদিকে বাঁকে। নকশার ভিতরে একটু খুঁত থাকে।
ওই খুঁতটুকই হইলো জিনিসটার রুহু।”
এরকম উত্তর আশা করি নি আসলে। ভাবনার জগতে ডুবে যাচ্ছিলাম, তখনি বৃদ্ধের প্রশ্ন, “হাত লুকাইয়া রাখসো ক্যান? কী হইসে হাতে?”
আমি পকেট থেকে হাত বের করলাম। কেন জানি এই অপরিচিত মানুষটার কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে দ্বিধা হলো না। বললাম আমার অবশ হয়ে যাওয়া আঙুলের কথা আর কীভাবে আমি সারাদিন কাঁচের ওপর আঙুল ঘষে মানুষের চেহারার সমস্ত খুঁত মুছে ফেলি সেই কথা।
তিনি আমার হাতটা নিজের খসখসে হাতের মুঠোয় নিলেন।
আমি চমকে উঠলাম।
গত দুই মাসে এই প্রথম আমি কোনো কিছুর স্পর্শ পুরোপুরি টের পেলাম বলে মনে হলো। তাঁর হাতের কড়া পড়া চামড়াটার ছোঁয়ায় আমার আঙুলের ডগায় শিরশির করে উঠল।
তিনি আমার আঙুলের ডগাগুলো টিপে দেখে বললেন, “তোমার হাত তো মরে নাই বাপ। তোমার হাত ভুইলা গেছে।
আচ্ছা কও তো, পানি না থাকলে আল্লাহ কী দিয়া পাক-পবিত্র হইতে কইসেন? মাটি দিয়া। তায়াম্মুম কইরা।
কিন্তু শর্ত হইলো, সেই মাটিতে ধুলা থাকতে হইবো।
তোমার ওই অফিসের তেলতেলে কাঁচ বা প্লাস্টিকের টেবিলে হাত ঘইষা সারা জীবন তায়াম্মুম করলেও অজু হইবো না। কারণ কী জানো? কাঁচের গায়ে অহংকার থাকে, ও নিজের গায়ে কিচ্ছু লাগতে দেয় না।
আর মাটির গায়ে নম্রতা থাকে। মাটি যখন তোমার হাত আর মুখ ছোঁয়, ও তোমাকে মনে করাইয়া দেয়, তুমি আসমানে উড়ো না বাপ, এই ধুলা থেকেই আইছো, এই ধুলাতেই ফিরা যাইবা।
তোমরা তো ঘর থেইকা মাটি খেদাইতে গিয়া নিজের আসল পরিচয়টারেই খেদাইয়া দিসো।”
তিনি একটু থেমে বললেন, “হাশরের ময়দানে কী হইবো জানো? সূরা ইয়াসিনে আল্লাহ কইছেন—আজ আমি তাগো মুখে মোহর মাইরা দিমু, আর তাগো হাত আমার লগে কথা কইবো, তাগো পা সাক্ষী দিবো তারা দুনিয়ায় কী কামাই করছে।”
বৃদ্ধ লোকটা আমার হাতটা ছেড়ে দিলেন।
“মুখ তো সারাদিন মিছা কথা কয়। কিন্তু হাত মিছা কইতে পারে না। একজন কামারের হাত দেখলে বোঝা যায় সে লোহা পিটাইসে। চাষার হাত দেখলে বোঝা যায় সে মাটি চষছে।
মাইনষের চামড়ার ভাঁজ আর দাগ হইলো তার বাঁইচা থাকার সাক্ষী। সে কতবার হাসছে, কতবার রইদে পুড়ছে, তার হিসাব। তুমি সারাদিন কাঁচ ঘইষা মানুষের মুখ থেইকা সেই সাক্ষীগুলারে মুইছা দাও।
হাশরের দিন যখন তোমার হাত আল্লাহর সামনে কথা কইবো, তোমার এই তেলতেলে আঙুল কী কইবো বাপ? কইবো যে আমি সারাজীবন আসল জিনিসরে নকল বানাইছি?”
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আমি আমার নিজের হাতের দিকে তাকালাম। তিরিশ বছর বয়সী একটা মানুষের হাত, অথচ কী অদ্ভুত রকমের নিষ্প্রাণ, দাগহীন, ইতিহাসহীন। মনে হলো এই হাতটা আমার না, কোনো শোরুমের ম্যানিকিনের হাত।
“কী করব, চাচা?” আমার গলাটা নিজের কাছেই অচেনা শোনাল।
তিনি পাশে রাখা একটা অমসৃণ মেহগনি কাঠের টুকরা আর একটা মোটা শিরিষ কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“রোজ সন্ধ্যার পর আসবা। এক ঘণ্টা এই কাঠ ঘষবা। যতক্ষণ না আঙুলে ফোসকা পড়ে, ততক্ষণ ঘষবা। চামড়া না ছিঁড়লে ভিতরের গোশত টের পায় না যে সে বাঁইচা আছে।”
দুই
পরের এক মাস আমার জীবনে মোটামুটি দুইটা কাজ।
সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আমি বনানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওতে বসে গ্লাস ট্র্যাকপ্যাডে আঙুল ঘষি। মডেলের চোখের নিচের কালো দাগ মুছি, শাড়ির ভাঁজ সমান করি, চামড়াকে মাখনের মতো মসৃণ বানাই।
আর সন্ধ্যা হলেই আমি জেনেভা ক্যাম্পের ওই অন্ধকার গলিতে চলে যাই।
বৃদ্ধের নাম গফুর মিয়া। খুব কম কথা বলেন। আমি শুধু একটা পিঁড়িতে বসে খালি হাতে শিরীষ কাগজ দিয়ে কাঠ ঘষি।
তৃতীয় দিনেই শিরীষ কাগজ ঘষতে ঘষতে আমার তর্জনীর ফোসকাটা গলে রক্ত বের হলো। আমি ব্যথায় ‘আহ’ করে হাতটা টেনে নিলাম। মেজাজটা হঠাৎ বিগড়ে গেল, কী দরকার ছিল আমার এই বস্তির গলিতে এসে হাত নষ্ট করার!
গফুর চাচা কাজ থামালেন। একটা পরিষ্কার সুতির কাপড়ে তেল ভিজিয়ে আমার আঙুলে জড়িয়ে দিলেন। তারপর আঙুলটায় আলতো করে চাপ দিয়ে বললেন, “তোমার হাতের এই ফোসকাটা হইলো গিয়া তোমার হাতের তওবা। এতদিন যে নকল দুনিয়ার গোলামি করসো তার কাফফারা।”
সেই রাতে ব্যথায় আমার ঘুম আসছিল না। কিন্তু সেই ব্যথার ভেতর একটা অদ্ভুত প্রশান্তি ছিল। আমার মস্তিষ্ক যেন চিৎকার করে বলছিল আমি টের পাচ্ছি! আমি এখনো বেঁচে আছি!
সপ্তাহখানেক পর আমি আবিষ্কার করলাম কাঠেরও আলাদা ভাষা আছে। সেগুন কাঠ তেলতেলে কিন্তু জেদি। মেহগনি কাঠ শক্ত, সহজে বশ মানে না। আর গর্জন কাঠের গায়ে হাত বুলালে মনে হয় তার ভেতর নদীর স্রোত আটকে আছে।
একুশতম দিনে আমার আঙুলের অবশ ভাবটা পুরোপুরি চলে গেল।
ফোসকাগুলো শুকিয়ে সেখানে শক্ত কড়া পড়েছে। সেদিন সন্ধ্যায় আমি যখন কাঠের টুকরাটায় শেষবারের মতো তেল মাখাচ্ছিলাম, দেখলাম গফুর চাচা ওটাতে বাটালি দিয়ে একটা ছোট্ট ছবির ফ্রেম বানিয়েছেন। চারপাশে লতাপাতার নকশা।
কিন্তু ডান দিকের কোণায় একটা পাতা অর্ধেক কাটা, অসমাপ্ত।
আমি এর আগেও খেয়াল করেছি, তাঁর দোকানের সব আসবাবপত্রেই কোথাও না কোথাও একটা পাতা বা ফুল অর্ধেক ভাঙা থাকে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, সবগুলো নকশায় আপনি একটা পাতা অর্ধেক ভাঙা রাখেন কেন?”
গফুর চাচা বাটালিটা নামিয়ে রাখলেন। “আমাদের বাপ-দাদাদের ওস্তাদরা পারস্য আর তুরস্ক থেইকা এই কাজ শিইখা আসছিলেন।
তাদের একটা নিয়ম আছিল। তারা যখন মসজিদের গম্বুজে বা কাঠের মিম্বরে নকশা করত, ইচ্ছা কইরা একটা কোণায় একটু ভুল বা অসমান রাইখা দিত। কইত, নিখুঁত হওয়া খালি আল্লাহর সিফাত। বান্দার কাজ হইলো অপূর্ণ থাকা।”
তিনি ফ্রেমটার ভাঙা পাতাটায় আঙুল ছোঁয়ালেন।
“এমনকি আল্লাহর ঘর কাবা শরীফের দিকেও তাকাইয়া দেখো—ওই যে হাতীমের ভাঙা গোল দেয়ালটা, ওটা তো কাবা ঘরেরই অংশ আছিল। কুরাইশরা হালাল টাকায় কুলাইতে পারে নাই দেইখা অসম্পূর্ণ রাইখা দিছিল। নবীজি মক্কা বিজয়ের পর চাইলে ওটারে ভাইঙা একদম সমান চারকোনা বানাইয়া ফেলতে পারতেন। আল্লাহও তো চাইলে ফেরেশতা পাঠাইয়া নিখুঁত বানাইয়া দিতে পারতেন। দেন নাই।
মানুষের ওই অপূর্ণ চেষ্টাটারেই আল্লাহ কবুল কইরা নিছেন। যেই জিনিসে কোনো দাগ নাই, কোনো ফাটল নাই, মানুষের দিল সেইটারে বিশ্বাস করে না।
যেখানে একটু কমতি থাকে, একটু ভাঙা থাকে, আল্লাহর রহমত তো ওই ফাটল দিয়াই ঢোকে, বাপ। নিজের অক্ষমতার কথা ভাইবাই তো মানুষ দোয়া করে দিল খুইলা।”
কথাটা শোনার পর আমার মনে পড়ল রোবোটিক্স বিজ্ঞানী মাসাহিরো মোরির বিখ্যাত ‘আনক্যানি ভ্যালি’ তত্ত্বের কথা। কোনো কিছু যখন অতিরিক্ত নিখুঁত কিন্তু মানুষের মতো দেখতে হয় তখন মানুষের মস্তিষ্ক অবচেতনভাবেই সেটার প্রতি একটা শীতল ভয় বা বিতৃষ্ণা অনুভব করে।
কারণ আমাদের মস্তিষ্ক জানে প্রাণ মানেই অসামঞ্জস্য, প্রাণ মানেই খুঁত। চরম নিখুঁত হওয়া কেবল মৃত জিনিসেরই ধর্ম।
গফুর চাচা আমার কাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হইসে। তোমার হাত ভালো হইয়া গেছে। কাল থেইকা আর আসা লাগবো না। এখন নিজের কামে যাও।”
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। “আমার ওই কাজে ফিরতে ইচ্ছে করে না চাচা। মনে হয় আমি প্রতিদিন মানুষের রুহটা মুছে ফেলার কাজ করি।”
গফুর চাচা চশমার ফাটা কাঁচটার ভেতর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন।
“কাম ছাড়বা ক্যান? তুমি তো জানো ছবি কেমনে পরিষ্কার করতে হয়। তাইলে তুমি এমনভাবে ছবি পরিষ্কার করো, যাতে আলগা ময়লাটা যায়, কিন্তু মানুষের আসল দাগটা থাইকা যায়। কাঠের গিঁটটারে না কাইটা তার চারপাশ দিয়া নকশা তোলো।”
তিনি ওই কাঠের ফ্রেমটা আমার হাতে দিলেন।
“আর এইটা নিয়া যাও। যখনই হাত নিশপিশ করবো সব সমান কইরা ফেলার লাইগা, ওই ভাঙা পাতাটায় আঙুল ছোঁয়াইবা।”
তিন
পরদিন অফিসে ফিরে আমি আমার জীবনে সবচেয়ে বড় জুয়াটা খেললাম।
দেশের সবচেয়ে বড় একটা হেরিটেজ জুয়েলারি ও তাঁতের শাড়ির ব্র্যান্ডের ঈদ ক্যাম্পেইনের কাজ চলছিল। ছবিতে মডেল ছিলেন একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী, আর সাথে একজন গ্রামীণ তাঁতি।
এজেন্সির কড়া নির্দেশ ছিল মডেলের মুখের সব বলিরেখা মুছে ত্রিশ বছরের মতো বানিয়ে দিতে হবে, আর তাঁতির হাতের ময়লা ও রুক্ষ চামড়া যেন একদম মসৃণ দেখায়।
মনিটরের সামনে বসে আমি সেই মায়ের বয়সী মডেলের ছবিটা জুম করলাম। গফুর চাচার দেওয়া ফ্রেমটার ভাঙা পাতায় আঙুল ছোঁয়ালাম। তারপর আমার ডিজিটাল ব্রাশের সেটিংস বদলে ফেললাম।
আলো আর রঙের ভারসাম্য ঠিক করলাম, কিন্তু মডেলের চোখের কোণের হাসির ভাঁজগুলো একটুও মুছলাম না। গলার কাছে বয়সের সূক্ষ্ম ভাঁজটা রেখে দিলাম।
আর তাঁতি মানুষটার আঙুলের ফাটা চামড়া, নখের কোণের নীলচে রঙের দাগ আর শাড়ির অমসৃণ সুতার বুননগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুললাম।
পরদিন সকালে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ফাইল খুলেই চিৎকার করে উঠলেন।
“এটা কী করেছো তুমি! আনফিনিশড ফাইল ক্লায়েন্টের পোর্টালে কে আপলোড করতে বলেছে তোমাকে? মডেলের মুখে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে, হাতের শিরা দেখা যাচ্ছে! ইউ আর ফায়ারড!”
আমাকে অফিস থেকে বের হয়ে যেতে বলা হলো। আমি ডেস্কে বসে আমার জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম ভালোই তো হলো!
ঠিক দুপুর দুইটার দিকে ক্লায়েন্ট কোম্পানির মার্কেটিং হেড নিজে আমাদের অফিসে ফোন করলেন। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর আমতা আমতা করে ক্ষমা চাইতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ওপাশ থেকে মার্কেটিং হেড যা বললেন, তাতে পুরো রুম স্তব্ধ হয়ে গেল।
আমাদের ভুল করে আপলোড হওয়া ছবিগুলো সকালে তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় টেস্ট রান হিসেবে দু-ঘণ্টার জন্য পাবলিশ হয়ে গিয়েছিল।
মার্কেটিং হেড উত্তেজিত গলায় বললেন, “আপনাদের কোন রিটাচার এই কাজ করেছে? গত দুই বছর ধরে মানুষ আমাদের বিজ্ঞাপন দেখে কমেন্ট করত এগুলো এআই দিয়ে বানানো ছবি। কেউ বিশ্বাস করত না এগুলো আসল জামদানি।
আজ প্রথম মানুষ ছবিতে তাঁতির হাতের কড়া আর মডেলের আসল বয়স দেখে পাগলের মতো শেয়ার দিচ্ছে! দুই ঘণ্টায় আমাদের প্রি-অর্ডার তিনগুণ হয়ে গেছে!
মানুষ এখন নিখুঁত ছবি দেখলে স্ক্রল করে চলে যায়, এই ‘র’ টেক্সচারটাই এখন বিক্রি হচ্ছে! আমাদের পুরো ক্যাম্পেইনের ভিজ্যুয়াল ডিরেকশন আমরা ওই ছেলেটাকে দিতে চাই।”
ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ফোনের রিসিভারটা নামিয়ে হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কর্পোরেট দুনিয়া আবেগের ভাষা বোঝে না, কিন্তু বিক্রির ভাষা খুব ভালো বোঝে। গফুর চাচার সেই ‘ভাঙা পাতার খুঁত’ যে আজকের কৃত্রিম দুনিয়ায় সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য পণ্য হয়ে উঠবে, তা আমার বসদের হিসাবের বাইরে ছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি এক কেজি মিষ্টি কিনে জেনেভা ক্যাম্পের সেই গলিতে গেলাম।
গলিটা আগের মতোই অন্ধকার। কিন্তু গফুর চাচার দোকানের সামনে গিয়ে আমার পা জমে গেল।
দোকানটায় একটা মরিচা ধরা তালা ঝুলছে। তালার ওপর মাকড়সার জাল। দেখে মনে হয় অন্তত কয়েক বছর ধরে এই তালা কেউ খোলেনি।
পাশের দোকানে এক ছোকরা বসে কাঠের আলমারিতে বার্নিশ করছিল। আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, এই দোকানের গফুর চাচা কোথায়? কালকেও তো উনার সাথে কাজ করে গেলাম।”
ছেলেটা হাতের ব্রাশ থামিয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।
“গফুর ওস্তাদ?”
“হ্যাঁ! এই তো, কাল সন্ধ্যায়ও আমাকে এই ছবির ফ্রেমটা দিলেন।” আমি ব্যাগ থেকে কাঠের ফ্রেমটা বের করে দেখালাম।
ছেলেটা ফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার কপালে ঘাম জমল। সে ফিসফিস করে বলল, “ভাইজান, এইটা তো গফুর ওস্তাদের হাতের কাজ। কোণায় একটা পাতা ভাঙা রাখা এইটা ওস্তাদের চিহ্ন।”
“হ্যাঁ, কিন্তু উনি কই?”
“ভাইজান, গফুর ওস্তাদ তো করোনাকালের প্রথম দিকে মারা গেছেন। চার বছর হইয়া গেছে। উনার ছেলেমেয়ে কেউ নাই দেইখা দোকানটা সেই থেইকা তালা মারা।”
আমি বিশ্বাস করলাম না। করার কোন কারণও নেই।
“আমাকে পাগল পাইসো তুমি? এক মাস ধরে রোজ সন্ধ্যায় এখানে বসে কাঠ ঘষসি! এই যে দেখো আমার হাতের কড়া!” আমি আমার হাত দুটো তার মুখের সামনে ধরলাম।
ছেলেটা আমার হাতের দিকে তাকিয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল।
“ভাইজান, আপনে সন্ধ্যায় আইসা এই তালা মারা দোকানের সামনের সিঁড়িতে একলা বইসা থাকতেন। পকেট থেইকা একটা পুরান কাঠের টুকরা বাইর কইরা অন্ধকারে ঘষতেন।
আমরা ভাবতাম আপনে শহরের মানুষ, মাথায় কোনো চাপ গেছে, তাই কিছু কইতাম না। কিন্তু দোকানের তালা তো চার বছর ধইরা কেউ খোলেই নাই।”
পাশের দোকান থেকে এগিয়ে আসা মানুষগুলোর মুখ দেখে বুঝলাম ছেলেটা মিথ্যা বলছে না। সবাই কেমন দুঃখ আর ভয় মিশ্রিত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, খানিকটা মায়া ভরা করুণাও আছে বোধহয় সেই দৃষ্টিতে।
আমার চারপাশের পৃথিবীটা ঘুরতে শুরু করল। আমি তালাটার দিকে তাকালাম। মাকড়সার জালের ভেতর দিয়ে দোকানের ভেতরটা উঁকি দিয়ে দেখলাম। ভেতরে এক পুরু ধুলার আস্তরণ।
কোনো বাটালি নেই, কোনো মানুষ নেই। শুধু মেঝের ধুলার ওপর একটা জায়গায় স্পষ্ট হয়ে আছে দুটো পায়ের ছাপ আর কাঠের গুঁড়োর একটা ছোট্ট স্তূপ।
ছেলেটা ভয়ে ভয়ে বলল, “গফুর ওস্তাদ মারা যাওয়ার আগে খুব কানতেন। কইতেন মেশিন আইসা মানুষের হাত নষ্ট কইরা দিতাসে, দুনিয়াটা প্লাস্টিক হইয়া যাইতাসে।”
আমি আর সেখানে দাঁড়াতে পারলাম না। কখন কীভাবে বাসায় ফিরে এসেছি তাও জানি না। রাতে শরীর ভাঙা জ্বর এলো আর ঘোরের মধ্যে শুধু গফুর চাচাকে স্বপ্নে দেখলাম।
সুস্থ হতে বেশ কদিন লাগল। ধীরে ধীরে কাজে ফিরেছি। চাচার দেওয়া কাঠের ফ্রেমটা আমি আমার কাজের টেবিলের ওপর রেখেছি। সেখানে কোনো ছবি লাগাইনি। ফ্রেমের ভেতর দিয়ে পেছনের চুনকাম খসে পড়া অমসৃণ দেয়ালটা দেখা যায়।
তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটেছে আজ সকালে। সে কারণেই আসলে গল্পটা লিখতে শুরু করা।
অফিসে গিয়ে আমি আমার সেই ধবধবে সাদা, কাঁচের তৈরি ‘ম্যাজিক ট্র্যাকপ্যাড’টায় তর্জনী ছোঁয়ালাম আর সাথে সাথে আমার আঙুলের ডগায় একটা খসখসে অনুভূতি হলো।
আমি চমকে উঠে ট্র্যাকপ্যাডটা চোখের সামনে তুলে ধরলাম। নিখুঁত, সমান কাঁচের ঠিক মাঝখানটায় যেখানে আঙুল ঘষে আমি প্রতিদিন মানুষের মুখের দাগ মুছি সেখানে কে যেন বাটালি দিয়ে খুব সূক্ষ্ম একটা লতাপাতার নকশা খোদাই করে রেখে গেছে।
ডান কোণায় একটা পাতা অর্ধেক ভাঙা।
অস্পৃশ্য
না লেখা গল্প-০৭
২৮-১০-২০২৬




