কাঁঠালতলা

কাঁঠালতলা

আইসিইউ

রাত তিনটা পঁয়তাল্লিশ।

ছয় নম্বর বেডের বৃদ্ধ হুট করে চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলেন, “আযান হইসে?”

প্রশ্নটা শুনে শাহেদের হাত এমনভাবে কেঁপে উঠল যে স্যালাইনের ব্যাগটা প্রায় ছুটে পড়েই যাচ্ছিল।

আইসিইউতে বৃদ্ধরা রাতে কত কিছু জিজ্ঞেস করেন, ছেলে কই, বাড়ি যাব কবে, গরুটারে পানি দিসে নি কেউ। প্রশ্নটা তেমন কিছু না, শাহেদের হাত কেঁপেছিল সময়টার জন্য। তিনটা পঁয়তাল্লিশ।

এই সময়টা সে এতটাই ভালোভাবে চেনে যে চল্লিশ বছর ধরে না চেনার চেষ্টা করেও কোন লাভ হয় নি।

“না, চাচা,” স্যালাউইনের ব্যাগটা হুকে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে বলল সে। “এখনো দেরি আছে। ঘুমান।”

বৃদ্ধ ছাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার চোখ বন্ধ করলেন। শাহেদ বেডের মাথার কাছে রাখা কার্ডটা পড়ল, সন্ধ্যায় শিফট নেওয়ার সময় খেয়াল করে পড়া হয় নি। আব্দুর রব, আটাত্তর বছর, ঈশ্বরদী, পাবনা। পেশা, অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী।

শাহেদ কার্ডটা উল্টে রাখল, তারপর আবার সোজা করল, আবার উল্টে রাখল। বাকি রাত সে নার্সিং স্টেশনে বসে ছয় নম্বর বেডের দিকে তাকিয়েই রইলো কেবল।

মিরপুরের এই বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে শাহেদ বাইশ বছর ধরে আছে। উনপঞ্চাশ বছর বয়স এখন, সিনিয়র নার্স হয়েছে বছর কয়েক হলো, জুনিয়ররা ডাকে শাহেদ ভাই।

শাহেদের শিফটে মৃত্যু কম হয় এটা হাসপাতালে সবাই জানে। কোড ব্লু বাজলে সে সবার আগে দৌড়ায়, বুকে চাপ দিতে শুরু করে সবচেয়ে ঠিক ছন্দে, ঠিক শক্তিতে। মৃত্যু যেন তার কাছে এক আজন্ম শত্রু যাকে ঠেকিয়ে রাখার পণ তাকে সব সময় তাড়া করে।

কিন্তু কেন সেটা সে কখনো কাউকে বলে না।

আইসিইউর রাতগুলো কখনো নীরব থাকে না। মনিটরের বিপ বিপ, ভেন্টিলেটরের শব্দ, পাম্পের অ্যালার্ম চলতেই থাকে। কাচের দরজার বাইরে করিডোরে পরিবারগুলো মেঝেতে চাদর বিছিয়ে বসে থাকে ভোরের অপেক্ষায়। অনেকে মোবাইলে হাসপাতালের অ্যাপ খুলে রাখে, যেটায় মাসিক ফি দিলে রোগীর মনিটরের সংখ্যাগুলো দেখা যায়।

ভোরের দিকে নয় নম্বর বেডের একজন মারা গেলেন। এগারো দিন ভেন্টিলেটরে ছিলেন, বিল বাকি এক লাখ নব্বই হাজার। হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী পুরো বিল না মেটালে ডেথ সার্টিফিকেট নেই, লাশও বের হবে না। সাদা চাদরে ঢেকে সামনে একটা পর্দা টেনে ট্রলিতে করে লাশটা আইসিইউর এক কোনায় রাখা হলো। সকালে শিফট শেষ হওয়ার সময়ও সেটা সেখানে। শাহেদ পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, তাকাল না।

পরের রাতেও তিনটা পঁয়তাল্লিশে বৃদ্ধের চোখ খুলল। তার পরের রাতেও। নার্সিং চার্টে আগের শিফটের নার্স লিখে রেখেছিল, মাঝরাতে অস্থিরতা, সময় সম্পর্কে বিভ্রান্ত, আইসিইউ ডেলিরিয়াম।

চতুর্থ রাতে বৃদ্ধ প্রশ্নের পর আর ঘুমালেন না, মাস্কের ভেতর বিড়বিড় করতে লাগলেন।

“সবুজ বাতি নামা… নামাইয়া রাখ… নিচে দেখ, নিচে…”

জুনিয়র নার্স মেয়েটা বলল, শাহেদ ভাই, ঘুমের ইনজেকশনটা দিয়া দেই? ডাক্তার লেইখা গেছে দরকার হইলে দিতে। শাহেদ বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলল, দাও। বৃদ্ধ তখনো বিড়বিড় করছেন, চোখগুলো ছাদ পেরিয়ে দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে।

পাঁচ মিনিট পর বিড়বিড় থামল। আইসিইউ আবার চুপ। শাহেদ চার্টে লিখল, রোগী শান্ত, সিডেটিভ দেয়ার পর ঘুমাচ্ছেন। তারপর কলমটা নামিয়ে রেখে অনেকক্ষণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

পরদিন দুপুরে কনফারেন্স রুমে ডক্টর মাহফুজ পরিবারকে পরিস্থিতি বোঝালেন। ফুসফুস আর কিডনি দুটোই খারাপ হচ্ছে। যেকোনো সময় অক্সিজেন নেয়া আরও কমবে, তখন গলায় নল দিয়ে ভেন্টিলেটরে দিতে হবে, তারপর হয়তো ডায়ালাইসিস। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সম্ভাবনা খুব কম।

বৃদ্ধের বড় ছেলের নাম জাহিদ, ঈশ্বরদীর একটা স্কুলের অংকের শিক্ষক, বলল আব্বা ভর্তির আগের রাতে আমারে কইসিল, আমারে হাসপাতালে মারিস না, আমারে আমার কাঁঠালতলায় নিয়া যাইস।

ফোনের স্পিকারে ইতালি থেকে ছোট ভাই সোহেল বলল, ভাইয়া, এইসব আবেগের কথা। ডাক্তার যা কয়, সব করো, টাকা আমি দিমু। আব্বারে আমি দেশে আইসা দেখতে চাই।

শেষে একটা কাগজে সই হলো। সব রকম জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার সম্মতি, ভেন্টিলেটর, সিপিআর, সব। হাসপাতালের ভাষায়, ফুল কোড। সোহেল ইমেইলে সম্মতি পাঠাল, জাহিদ কাগজে সই করল।

বিকালে করিডোরে জাহিদ চা হাতে শাহেদের পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, "শুনছি আপনি রাতে আব্বার কাছে থাকেন। আমগো উঠানের কাঁঠাল গাছ। আমি যেই বছর হইছি, ওই বছর আব্বা লাগাইছিল। গ্রামের সবাই কয় গাছটার বয়স জাহিদের বয়স সমান।”

শাহেদের হাতের কাপটা কাত হয়ে গরম চা আঙুলে লাগল। জাহিদ নামটা সে চল্লিশ বছর মুখে আনেনি।

সেই রাতে বৃদ্ধকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়নি। শাহেদ জুনিয়র নার্সের হাত থেকে সিরিঞ্জটা নিয়ে বলেছিল, আজকে লাগবে না, আমি দেখতেছি। আর তিনটা পঁয়তাল্লিশে বৃদ্ধ যখন আবার নিচে দেখ, নিচে দেখ বলতে লাগলেন, শাহেদ বেডের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

সকালে ডা. মাহফুজ চার্ট দেখে শাহেদকে চেম্বারে ডেকে দরজা বন্ধ করে রাতের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বসলেন। দুপুরে নার্সিং সুপারভাইজার তাকে দিয়ে একটা লিখিত সতর্কবার্তায় সই করিয়ে নিলেন। বাইশ বছরে এই প্রথম।

কাল শাহেদের সাপ্তাহিক ছুটি। রাতের শিফট শেষ করে সে কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে টিকিট কাউন্টারের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। পেছনের লোকটা বিরক্ত কাশি শুনে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কাউন্টারে বলল,

“ঈশ্বরদী,” সে বলল। “ভোরের ট্রেন।”

চল্লিশ বছর সে ঈশ্বরদী যায়নি। উত্তরবঙ্গের সব ট্রেন ঈশ্বরদী হয়ে যায়, তাই সে উত্তরবঙ্গেও কোনোদিন যায়নি।

ঈশ্বরদী

কলোনির বস্তিটা আর নেই। যেখানে ছিল, সেখানে এখন রেলের একটা নতুন গুদাম। শুধু লোকো শেডের পাশের পুকুরটা আছে, আর পুকুরপাড়ের তালগাছটা, যেটায় উঠতে গিয়ে আট বছর বয়সে শাহেদ একবার পড়ে গিয়েছিল।

সে পুকুরপাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হেঁটে গেল স্টেশনের দিকে, তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে।

পঁচাশি সালের পৌষ মাস। কলোনির বস্তির বাচ্চারা সব ট্রেনের সময় মুখস্থ জানত, কোনটা কখন আসে, কতক্ষণ দাঁড়ায়, কোন ইঞ্জিন থেকে বেশি কয়লা পড়ে। রাতের মেইল ছাড়ত তিনটা পঁয়তাল্লিশে। কয়লার ইঞ্জিন, দাঁড়িয়ে থাকার সময় লাইনের পাশে কয়লার টুকরা পড়ত। ভোরের আগে রেল পুলিশ ঘুমায়, তাই ওই সময়টাই কয়লা টোকানোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

শাহেদ আর জাহিদ একসাথে যেত। জাহিদ ছিল শাহেদের চেয়ে এক বছরের ছোট, কিন্তু অন্ধকারে ওর চোখ ভালো কাজ করতো, তাই বস্তাটাও ভরতো বেশি। দুইজনের মা একসাথে অফিসারদের বাসায় কাপড় কাচতো। আর মেইলের গার্ড, লম্বা, শান্ত একজন মানুষ, মাঝে মাঝে গার্ডের কামরা থেকে নেমে দুইজনের হাতে প্যাকেট থেকে দুইটা করে বিস্কুট দিতেন।

সেই কালো শীতের ভোরে ছিল ঘন কুয়াশা। দুইজন মিলে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাশে কয়লা টোকাচ্ছিল, হঠাৎ দূরে একটা টর্চের আলো জ্বলে উঠল। একজন রেল পুলিশ, হাতে লাঠি।

শাহেদ দৌড় দিল। তিন নম্বরে যাওয়ার সবচেয়ে কাছের রাস্তা মাঝখানে দাঁড়ানো মেইলের নিচ দিয়ে, দুই বগির মাঝখানে হামাগুড়ি দিয়ে। কলোনির সব বাচ্চা এভাবেই পার হতো।

সে পার হয়ে তিন নম্বরের দিকে উঠে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে দেখল জাহিদ তখনো ওপাশে, ভারী বস্তাটা পিঠে তোলার চেষ্টা করছে। শাহেদ চিৎকার করল, জাহিদ, আয় এইদিক দিয়া, তাড়াতাড়ি কর, পুলিশ আইতেছে।

জাহিদ বস্তা পিঠে নিয়ে নিচু হয়ে বগির নিচে ঢুকল। বস্তাটা লোহার কিছুতে আটকে গেছিল, সে টানছিল ছুটিয়ে আনতে। কুয়াশার ভেতরেই গাড়ির শেষ মাথায় একটা সবুজ আলো উঁচু হলো। তারপর বাঁশি।

শাহেদ তিন নম্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে বগির নিচে জাহিদের মুখ দেখতে পাচ্ছিল অন্ধকারে, তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর একটা ঝাঁকুনি, লোহার শব্দ, একটা ছোট চিৎকার... তারপর ইঞ্জিনের শব্দে আর কিছু শোনা যায়নি।

শাহেদ দৌড়েছিল সব ফেলে। রেললাইন পার হয়ে বস্তির গলি দিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকে চৌকির নিচে এসে থেমেছিল, কাঁপছিল অনেকক্ষণ ধরে। মা দুপুরে কাজ থেকে ফিরে টেনে বের করা পর্যন্ত সেখানেই শুয়ে ছিল।

সবাই জেনেছিল জাহিদ ট্রেনের নিচে কাটা পড়েছে। কেউ কখনো জানতে পারে নি ওপাশ থেকে কে জাহিদকে ডেকেছিল। শাহেদ কাউকে বলেনি, মাকেও না। পরের বছর বাবা মারা গেলেন, মা তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে এলেন, মিরপুরের একটা গার্মেন্টসে কাজ নিলেন। শাহেদ পড়াশোনা করেছে, তারপর এমন এক পেশা বেছে নিয়েছে যেখানে মৃত্যু আটকানোর চেষ্টাই তার কাজ।

বাইশ বছর ধরে প্রতি রাতের শিফটে তিনটা পঁয়তাল্লিশ বাজলে সে কোনো একটা কাজে হাত ব্যস্ত রাখে, স্যালাইন বদলায় কিংবা চার্ট লেখে। ঘড়ির দিকে তাকায় না ভুলে।

লোকো শেডের পাশের চায়ের দোকানে নজরুলের নাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার দেখিয়ে দিল, বেঞ্চের কোনায় বসা মোটা চশমার একজন বুড়োকে। সেই সময়ের পয়েন্টসম্যান, এখন তিরাশি বছর বয়স।

শাহেদ পরিচয় দিল। নিজের মায়ের নাম বলল। নজরুল অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “ধোপানির পোলা শাহেদ? ঢাকায় চইলা গেছিলি না? এত বছর পর আইলি!”

শাহেদ আব্দুর রবের কথা বলল, রাত তিনটা পঁয়তাল্লিশের গোঙানি আর বিড়বিড় করার কথা। নজরুল চাচা চায়ে ভেজা পাউরুটিটা কাপেই রেখে দিলেন।

রব ভাই, নজরুল চাচা বললেন, জাহিদকে নিজের গ্রামে নিয়া গেসিল। জাহিদের মা আমেনার কোনো গ্রাম আছিল না, কবর দেওয়ার জায়গা আছিল না। রব ভাই নিজের উঠানে নিজের হাতে কবর খুঁড়সিলেন। কবর দেয়ার দুই দিন পর জাহিদের মাথার কাছে একটা কাঁঠালের চারা লাগাইসিলেন, আমেনাকেও নিয়ে গিয়ে উঠানের কোনায় ঘর তুইলা দিসিলেন। ঐ বছরই রব ভাইয়ের একটা ছেলে হইলো। নাম রাখলেন জাহিদ।

তারপর প্রত্যেক ইস্টিশনে, প্রত্যেকবার বাতি দেখানের আগে রব ভাই প্ল্যাটফর্মে হাঁটু গাইড়া বইসা টর্চ মাইরা গাড়ির নিচে দেখত। বগি থেইকা বগি, চল্লিশ বচ্ছর। তদন্তে কইসিল রব ভাইয়ের দোষ নাই। রব ভাই কখনো মানতে পারে নাই।

শাহেদ চুপ করে সব শুনল, কিছু বলল না। নজরুল চাচা তার দিকে চশমার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে রইলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তুই তো জাহিদের লগে ঘুরতি, ওইদিন আছিলি না?

শাহেদ উঠে দাঁড়াল, বলল, যাই।

তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে একটা লোকাল ট্রেন ছাড়ছিল। শেষ বগির দরজায় মাঝবয়সী একজন গার্ড, এক হাতে সবুজ পতাকা, আরেক হাতে মোবাইল কানে। বাঁশি বাজলে গার্ড মোবাইল কানে রেখেই পতাকা নাড়লেন, গাড়ি নড়ে উঠল।

শাহেদ প্ল্যাটফর্মের কিনারায় হাঁটু গেড়ে বসে চলন্ত বগিগুলোর নিচে তাকাল। চাকা, লোহা, অন্ধকার, আলো। কেউ নেই। ট্রেনটা চলে যাওয়ার পরও সে অনেকক্ষণ ওভাবেই বসে রইল, খালি লাইনের দিকে তাকিয়ে।

তিনটা পঁয়তাল্লিশ

পরের রাতে শাহেদের শিফট। তিনটা বিশে ছয় নম্বর বেডের মনিটরে অক্সিজেনের সংখ্যাটা নামতে শুরু করল। আটাশি, চুরাশি, একাশি। বৃদ্ধের বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল, গলার শিরা ফুলে উঠছিল, মাস্কের ভেতর নিঃশ্বাসের শব্দ ভারী হয়ে আসছিল।

এর পরের ধাপ শাহেদ মুখস্থ জানে। ডিউটি ডাক্তারকে ডাকা, কোড টিমকে খবর দেওয়া, গলায় নল, ভেন্টিলেটর। ফাইলে সই করা কাগজটায় লেখা আছে ফুল কোড। ভেন্টিলেটরটা ইতিমধ্যে বেডের পাশে এনে রাখা। একবার নল ঢুকলে বৃদ্ধ আর কোনোদিন কথা বলতে পারবেন না। কয়েক দিন, হয়তো কয়েক সপ্তাহ, তারপর এখানে এই আলোর নিচে যন্ত্রের শব্দের মাঝে শেষ বিদায়।

জুনিয়র নার্স মেয়েটা দৌড়ে এলো। ভাইয়া, স্যাচুরেশন আটাত্তর, কোড ডাকমু? শাহেদ বলল, দাঁড়াও। মেয়েটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল, কারণ বাইশ বছরে শাহেদ ভাই কোনোদিন কোডের আগে দাঁড়াতে বলেনি।

শাহেদ বেডের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। ঘড়িতে তিনটা পঁয়তাল্লিশ।

বৃদ্ধের চোখ খুলল। “আযান হইসে?”

শাহেদ মাস্কটা একটু সরিয়ে বৃদ্ধের কানের কাছে মুখ নিল। চল্লিশ বছর সে এই কথাগুলো কাউকে বলেনি, মনে মনেও বলেনি।

“চাচা, আমি শাহেদ। কলোনির ধোপানির পোলা। জাহিদের লগে কয়লা টোকাইতাম। আপনে আমাদের বিস্কুট দিতেন।” গলা ভেঙে আসছিল, সে থামল না। “ওইদিন ভোরে আমি আগে পার হইসিলাম। তারপর ওইপাশ থেইকা জাহিদরে ডাকসিলাম। তাড়াতাড়ি আয়, এইদিক দিয়া। আমি ডাকসিলাম, চাচা।”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখ দুটো ঘোলা। শুনলেন কি না, বুঝলেন কি না, চিনলেন কি না, কিছুই বোঝা গেল না। শুধু ঠোঁট নড়ল, আর নলের হিসহিসের ভেতর দিয়ে কয়েকটা শব্দ এলো।

“নিচে দেখসো?”

শাহেদ মাথা নামিয়ে বেডের নিচে তাকাল। অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাকা, তারের জট, মেঝের সাদা টাইলস। তারপর মুখ তুলে বলল, “দেখসি, চাচা। কেউ নাই।”

বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন। মনিটরে সংখ্যাটা চুয়াত্তর।

শাহেদ উঠে দাঁড়াল, কাচের দরজা খুলে করিডোরে গেল। জাহিদ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছিল, মাথা দেয়ালে হেলানো। শাহেদ তার কাঁধে হাত রাখল।

জাহিদকে সে সব বলল। না, সব না, শুধু চিকিৎসার কথাটুকু। এখন ভেন্টিলেটরে দিলে আপনার আব্বা হয়তো কয়েক সপ্তাহ বাঁচবেন, কিন্তু আর কথা বলবেন না, বাড়িও যাবেন না। এখন নিয়ে গেলে হয়তো বাড়ি পৌঁছানোর আগেই। সিদ্ধান্ত আপনার।

জাহিদ অনেকক্ষণ শাহেদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফোন বের করে ইতালিতে ছোট ভাইকে কল দিল, রিং হলো, কেউ ধরল না। সে ফোনটা পকেটে রেখে বলল, “কাগজ আনেন।”

ডিউটি ডাক্তার এলেন ঘুম ঘুম চোখে, পুরো ব্যাপার শুনে মাথা নাড়লেন। পরামর্শের বিরুদ্ধে ছুটির কাগজে সই হতে পারে, কিন্তু রোগী গেট পার হবে না। দুই লাখ আশি হাজার টাকার বিল বাকি, অ্যাকাউন্টস খোলে সকাল নয়টায়, ক্লিয়ারেন্স ছাড়া সিকিউরিটি স্ট্রেচার বের হতে দেবে না। নয় নম্বর বেডের পেশেন্টের দেহ তখনো হসপিটালে আটকে রাখা, নিয়ে যেতে দেয়া হয় নি।

শাহেদ নার্সিং স্টেশনে গিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা ফর্ম বের করল। জামিনদারের অঙ্গীকারনামা, যেটা সাধারণত রোগীর আত্মীয়রা সই করে। বকেয়া বিল পরিশোধের দায়িত্ব নিচের স্বাক্ষরকারী গ্রহণ করছেন। সে নিজের নাম লিখল, কর্মচারী আইডি নম্বর লিখল, সই করল।

তারপর ডা. মাহফুজকে ফোন করল, ভোর চারটায়। ডা. মাহফুজ শুনলেন, অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তুমি কী করতেসো, তুমি জানো, শাহেদ?” শাহেদ বলল, জানি, স্যার। ওপাশে আবার নীরবতা। তারপর ডা. মাহফুজ বললেন, “সিকিউরিটিকে আমার নাম বলো। বাকিটা সকালে দেখতেসি।”

অ্যাম্বুলেন্স ছাড়ল চারটা চল্লিশে। পোর্টেবল অক্সিজেন, একটা মনিটর, পেছনে স্ট্রেচারে বৃদ্ধ, মাথার কাছে জাহিদ, পায়ের কাছে শাহেদ। জুনিয়র নার্স মেয়েটাকে শাহেদ বাকি শিফটটা দেখতে বলে এসেছিল, মেয়েটা কিছু না বলে মাথা নেড়েছিল।

মিরপুর পার হয়ে, গাবতলী, সাভার, তারপর ফাঁকা হাইওয়ে, কুয়াশায় হেডলাইটের আলো দশ হাত গিয়ে থেমে যায়। জাহিদ বাবার মাথাটা কোলে নিয়ে কানের কাছে আস্তে বলছিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। শাহেদ বৃদ্ধের কবজিতে আঙুল রেখে বসে ছিল। মনিটরের সংখ্যাটা নামছিল, সে আর মনিটরের দিকে তাকাচ্ছিল না।

কালিয়াকৈরের কাছে রাস্তার পাশের একটা মসজিদ থেকে অ্যাম্বুলেন্সের খোলা জানালা দিয়ে ফজরের আযান ঢুকল। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। বৃদ্ধের ঠোঁট একবার নড়ল। আযান শেষ হওয়ার আগেই শাহেদের আঙুলের নিচের ছন্দটা থেমে গেল।

সে অভ্যাসবশত কবজির ঘড়ির দিকে তাকাতে গেল মৃত্যুর সময় লিখে রাখার জন্য। তারপর মনে হলো না তাকালেও চলে।

আব্দুর রবকে কবর দেওয়া হলো সেদিন আসরের পর। তাঁর বাড়ির উঠানে, কাঁঠাল গাছটার গোড়ায়, শিকড়ের ফাঁকে একটা ছোট্ট ঘাসে ঢাকা ঢিবির ঠিক পাশে। ঢিবিটার মাথার কাছে একটা ইট পোঁতা। ফলক না, শুধু একটা ইট।

কবর খুঁড়তে খুঁড়তে জাহিদ একসময় থামল, ঘামে ভেজা মুখে ছোট ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, এইটা কার কবর আমি জানি না। ছোটবেলা থেইকা দেখি কিন্তু আব্বা কোনোদিন কয় নাই। খালি কইছে, আমারে ওর পাশে শোয়ায়ে দিস।

শাহেদ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ছোট ঢিবিটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

“ওর নামও জাহিদ আছিল,” সে বলল। “আমার লগে কয়লা টোকাইত, ঈশ্বরদী ইস্টিশনে। আপনার আব্বার সিগনালে রেলগাড়ির নিচে কাটা পড়সিল।” একটু থামল। “ওইদিন ভোরে ঐপাশ থেইকা আমি ওরে ডাকসিলাম।”

জাহিদ ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়লে কোদালের হাতলে ভর দিয়ে। সত্যটার ভার যেন নিতে পারছিল না তার ক্লান্ত দুই পা।

অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। শুধু কাঁঠাল গাছটার পাতায় পাতায় বাতাসের শব্দ...

কাঁঠালতলা।

না লেখা গল্প-০৪

Share This Post

Related Blog

অস্পৃশ্য

অস্পৃশ্য

সকালের নাশতার টেবিলে গরম চায়ের কাপটা ধরতে গিয়ে আমি ব্যাপারটা প্রথম টের পেলাম। কেন যেন ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ডগায় কোন অনুভূতি নেই। কাপটা হাত ...
পিঁপড়ের লাইন

পিঁপড়ের লাইন

৪ জানুয়ারি, রবিবারএই ডায়েরিটা আমাকে আম্মু কিনে দিয়েছে। বলেছে প্রতিদিন লিখতে হবে, তাহলে বাংলা রচনায় হাত ভালো হবে। ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় র...