গুলশান-২
ফ্ল্যাট সিক্স-বি
রাত একটা কুড়ি।
সিসিটিভি ফিডে ছায়াটা নড়ছে না দেখে রিয়ান মাউসটা আরেকটু কাছে টানল।
সত্তর ইঞ্চি টিভির সামনে রকিং চেয়ারটায় মোজাফফর সাহেব যেভাবে সন্ধ্যা সাতটায় বসেছিলেন, এখনো ঠিক সেভাবেই বসে আছেন। মাথার ওপরে সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে। টিভির আলোয় তাঁর সাদা পাঞ্জাবির ওপর নীলচে আভা পড়ছে আর নিভছে।
রিয়ান হেডফোনটা কানে চেপে ধরে মাইক্রোফোনের বাটন টিপল।
"আঙ্কেল? রাত একটা বাজে। ওষুধ খাইসেন?"
রকিং চেয়ারের হাতল থেকে বৃদ্ধের ডান হাতটা সামান্য উঠল, আবার পড়ে গেল। বসার ঘরের কোণায় লাগানো স্পিকার থেকে রিয়ানের গলাটা পুরো ফ্ল্যাটে প্রতিধ্বনিত হলো, তারপর মিলিয়ে গেল। কোনো উত্তর এল না।
রিয়ান নিজের ড্যাশবোর্ডে ঢুকে 'রাত একটার চেক-ইন' বক্সে টিক দিল। স্ট্যাটাস লিখল: ক্লায়েন্ট রেসপন্সিভ। টিভি দেখছেন।
রিয়ানের সামনে পনেরোটা আলাদা উইন্ডো খোলা। উত্তরা, ধানমন্ডি, বনানী, বসুন্ধরা, ঢাকার সবচেয়ে দামি ফ্ল্যাটগুলোর বসার ঘর আর বেডরুমের নিঃশব্দ ছবি। কোণায় কোণায় সবুজ বিন্দু জ্বলছে। রিয়ান একা নয়, কারওয়ান বাজারের এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফ্লোরে ওর মতো আরও ত্রিশজন ছেলেমেয়ে বসে আছে। কোম্পানির নাম ‘কেয়ার নেস্ট’। প্রবাসী সন্তানদের জন্য প্রিমিয়াম প্যারেন্টাল মনিটরিং সার্ভিস।
মাসে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার 'গোল্ড প্যাকেজ' নিলে চব্বিশ ঘণ্টা এআই চালিত মোশন ট্র্যাকিং, দিনে তিনবার রক্তচাপ আর সুগার মাপার জন্য নার্স ভিজিট আর রাতে নিঃসঙ্গতা কাটাতে বিশ মিনিটের ‘কম্প্যানিয়নশিপ কল’।
রিয়ান এই রাতের শিফটের টিম লিডার। বয়স ছাব্বিশ। সে এখন মুখস্থ জানে কোন উইন্ডোর মানুষটা কখন ঘুমায় কখন জাগে, কার ইনহেলার কোন ড্রয়ারে থাকে, কে মাঝরাতে একা একা বাথরুমের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু সিক্স-বি ফ্ল্যাটের মোজাফফর সাহেবকে সে গত চার মাসেও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
লোকটা আগে সরকারি কলেজের বাংলার অধ্যাপক ছিলেন। স্ত্রী মারা গেছেন বছর পাঁচেক হলো। একমাত্র ছেলে ফারহান শিকাগোতে থাকে, পিএইচডি শেষ করে কর্পোরেটে ঢুকে এখন বড় কোনো এক ফার্মের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ফ্ল্যাটে তিনবেলা রান্নার জন্য লোক আসে, ঘর মোছার লোক আসে, কাপড় ধোয়ার লোক আসে। সবাই আসে নির্ধারিত সময়ে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ঢোকে, কাজ শেষ করে চলে যায়। কেউ কারও সাথে কথা বলে না। এজেন্সির কড়া নিয়ম হলো ক্লায়েন্টের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলা নিষেধ, প্রফেশনাল বাউন্ডারি বজায় রাখতে হবে।
গত মাসে ফারহান সাহেবের সাথে জুম মিটিংয়ে রিয়ানের কথা হয়েছিল। ভদ্রলোকের পেছনে শিকাগোর ঝকঝকে অ্যাপার্টমেন্টের বইয়ের তাক দেখা যাচ্ছিল। তিনি খুব গুছিয়ে বলেছিলেন, "রিয়ান, আই ভ্যালু ইন্ডিপেন্ডেন্স। আব্বার নিজের স্পেস দরকার, আমারও নিজের লাইফ আছে। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল বা ডিপেন্ডেন্সি আমাদের দুজনের কারোরই গ্রোথের জন্য ভালো না। আপনারা প্রফেশনাল, ইউ হ্যান্ডেল ইট। জাস্ট মেইক শিওর হি ইজ সেফ।"
রিয়ান বলেছিল, "শিওর স্যার। উই গট দিস।"
রাত আড়াইটায় সিক্স-বি ফ্ল্যাটের ফিডে অ্যালার্ম বাজল। লাল রঙের পপ-আপ: ফল ডিটেক্টেড।
রিয়ান চমকে সোজা হয়ে বসল। রকিং চেয়ারটা খালি। টিভির সামনের কার্পেটে মোজাফফর সাহেব উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর চশমাটা ছিটকে গেছে সোফার নিচে।
রিয়ান প্রটোকল জানে। ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমকে কল দেওয়া, বিল্ডিংয়ের গার্ডকে জানানো, আর প্রাইমারি কন্টাক্ট মানে শিকাগোতে ফারহান সাহেবকে নোটিফিকেশন পাঠানো। সে তিনটে কাজই এক মিনিটের মধ্যে শেষ করল।
তারপর মাইক্রোফোন অন করে ডাকতে শুরু করল, "আঙ্কেল! আঙ্কেল, শুনতে পাচ্ছেন? নড়বেন না, মানুষ আসতেসে। আঙ্কেল?"
মোজাফফর সাহেব নড়লেন। খুব ধীরে কনুইয়ে ভর দিয়ে মাথাটা তুললেন। ক্যামেরার দিকে তাকালেন না, তাকালেন সামনের সেন্টার টেবিলের দিকে। সেখানে রাখা কাঁচের জগটাতে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করলেন। হাতটা কাঁপছিল। জগটা কাত হয়ে কার্পেটে পানি গড়িয়ে পড়ল, গ্লাসটা ভেঙে গেল।
রিয়ানের অফিস কারওয়ান বাজারে, সেখান থেকে গুলশান-২ যেতে ইমার্জেন্সি ভ্যানের সময় লাগবে অন্তত পঁচিশ মিনিট। বিল্ডিংয়ের গার্ডের কাছে মাস্টার কী থাকে না, দরজা ভাঙতে ফায়ার সার্ভিস বা পুলিশের ক্লিয়ারেন্স লাগে, প্রাইভেসি পলিসি।
স্ক্রিনে দেখা গেল মোজাফফর সাহেব ভাঙা কাঁচের ওপর দিয়েই হাতটা টেনে নিচ্ছেন। হাতের তালু কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, সাদা কার্পেটে লাল দাগ লাগছে। বৃদ্ধ সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। তিনি মেঝেতে শুয়েই হাঁপাচ্ছেন।
মাইক্রোফোনে তাঁর ফ্যাসফেসে গলা শোনা গেল, "বাবা... একটু পানি দিবি?"
রিয়ানের গলাটা শুকিয়ে গেল। স্ক্রিনের নিচে একটা সবুজ মেসেজ ভেসে উঠেছে। শিকাগো থেকে ফারহান সাহেব রিপ্লাই দিয়েছেন: Received alert. In a board meeting right now. Please initiate premium hospitalization protocol. Card on file is active.
রিয়ান মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। কার্ড অন ফাইল ইজ অ্যাক্টিভ।
পাশের ডেস্কের ছেলেটা বলল, "রিয়ান ভাই, ভ্যান তো মহাখালী ফ্লাইওভারে জ্যামে পড়সে। আরও বিশ মিনিট লাগবে।"
রিয়ান হেডফোনটা খুলে রাখল। তার বাসা বাড্ডায়। এই মুহূর্তে তার নিজের বাইকটা নিচে পার্কিংয়ে রাখা। কারওয়ান বাজার থেকে হাতিরঝিল হয়ে গুলশান-২ যেতে বাইকে রাত আড়াইটায় সময় লাগে এগারো মিনিট। আর মোজাফফর সাহেবের ফ্ল্যাটের ডিজিটাল লকের কোডটা রিয়ানের মুখস্থ, নার্সদেরকে মাঝে মাঝে ও-ই লগ-ইন করে দেয়।
কিন্তু কোম্পানির পলিসি বইয়ের চার নম্বর পাতায় স্পষ্ট লেখা আছে: ম্যানেজার বা মনিটরিং এজেন্ট কোনো অবস্থাতেই ক্লায়েন্টের বাসায় সশরীরে প্রবেশ করতে পারবে না। এটি ক্লায়েন্টের প্রাইভেসি ও অটোনমির চরম লঙ্ঘন এবং তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতির কারণ।
স্ক্রিনে মোজাফফর সাহেবের শরীরটা একবার ঝাঁকুনি দিল। তিনি শুকনো ঠোঁটটা কার্পেটের ভেজা জায়গাটায় ছোঁয়ানোর চেষ্টা করছেন, যেখানে জগের পানিটুকু পড়েছিল।
রিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে বাইকের চাবিটা নিল।
------
গুলশান-২
দরজার ডিজিটাল লকে আঙুল ছোঁয়াতেই ‘বিপ’ করে সবুজ বাতি জ্বলল। রিয়ান ভেতরে ঢুকল।
ফ্ল্যাটটা হিমশীতল। এসি চলছে আঠারো ডিগ্রিতে। একটা অদ্ভুত গন্ধ—দামি এয়ার ফ্রেশনার আর ওষুধের গন্ধ মেশানো। যে গন্ধটা ক্যামেরায় কখনো ধরা পড়ে না।
রিয়ান দৌড়ে বসার ঘরে গেল। মোজাফফর সাহেব তখনো মেঝেতে। টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে বরফের দেশের পেঙ্গুইন দেখাচ্ছে। রিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে বৃদ্ধের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। লোকটা এত হালকা হয়ে গেছেন যে তোলার সময় মনে হলো কেবল একটা খাঁচা।
"আঙ্কেল, আমি রিয়ান। এই যে, পানি আনছি।"
রিয়ান ডাইনিং টেবিল থেকে পানির বোতল এনে বৃদ্ধের মুখে একটুখানি ঢেলে দিল। পানিটুকু গড়িয়ে তাঁর সাদা দাড়ি ভিজিয়ে দিল, কিছুটা ভেতরে গেল।
মোজাফফর সাহেব ঘোলাটে চোখে রিয়ানের দিকে তাকালেন। তারপর নিজের রক্তমাখা বাঁ হাতটা তুলে রিয়ানের গালটা ছুঁলেন।
রিয়ান চমকে উঠল। গত চার মাস ধরে সে এই মানুষটাকে প্রতিদিন ছত্রিশ ইঞ্চি মনিটরে হাই ডেফিনিশনে দেখেছে। তাঁর হার্টরেট, তাঁর অক্সিজেন লেভেল, তাঁর ঘুমের গ্রাফ সব রিয়ানের নখদর্পণে। কিন্তু রিয়ান জানত না লোকটার হাতটা এত ঠান্ডা।
বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বললেন, "তুই আসলি, বাবা? তোর না মিটিং?"
রিয়ান কিছু বলতে পারল না। তার গালের ওপর বৃদ্ধের হাতের রক্তটুকু আঠার মতো লেগে যাচ্ছে।
"আমার খুব শীত করে রে, ফারহান," মোজাফফর সাহেব রিয়ানের শার্টের কলারটা মুঠো করে ধরলেন। তাঁর আঙুলে কোনো জোর নেই, তবু রিয়ান ছাড়াতে পারল না। "এই ঘরটায় বাতাস নাই। মানুষ নাই। খালি লাল বাতি জ্বলে। ওই কোণায়... ওই যে..."
রিয়ান কোণার সিসিটিভি ক্যামেরাটার দিকে তাকাল। সেটার নিচে ছোট্ট একটা লাল এলইডি বাতি জ্বলছে। অফিসে এই মুহূর্তে হয়তো অন্য কেউ স্ক্রিনে দেখছে। রিয়ান মেঝেতে বসে আছে, প্রটোকল ভেঙে।
বৃদ্ধের চোখ দুটো আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসছে। শ্বাসটা ছোট হয়ে আসছে। তবু মুখে একটা অদ্ভুত স্বস্তি। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "আমার হাতটা ছাইড়ো না। মেশিনগুলারে বন্ধ করতে বলো। খুব শব্দ করে..."
রিয়ান তাঁর ঠান্ডা হাতটা নিজের দুই হাতের তালুর ভেতর চেপে ধরল। রুমের চারপাশে তাকাল। এয়ার পিউরিফায়ারের গুনগুন, ফ্রিজের শব্দ, ডিজিটাল ঘড়ির টিকটিক, রাউটারের নীল বাতি। সব চলছে নিখুঁত নিয়মে। শুধু মানুষটা থেমে যাচ্ছে।
দশ মিনিট পর যখন ইমার্জেন্সি প্যারামেডিক টিম দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, মোজাফফর সাহেবের হাতটা তখনো রিয়ানের হাতের মুঠোয়। কিন্তু সেই হাতে আর কোনো স্পন্দন নেই।
---
সকাল নয়টা
রিয়ান এইচআর ম্যানেজারের রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে এসে বসল। তার সামনে টার্মিনেশন লেটার। প্রাইভেসি পলিসি ভায়োলেশন এবং আনপ্রফেশনাল ইমোশনাল ইনভলভমেন্ট। শিকাগো থেকে ফারহান সাহেব সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কেন একজন অপরিচিত কল সেন্টার কর্মী তাঁর বাবার গায়ে হাত দিয়েছে, কেন প্রপার মেডিকেল প্রটোকলের জন্য অপেক্ষা করেনি। তিনি কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছিলেন, কোম্পানি রিয়ানকে বরখাস্ত করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।
রিয়ান নিজের ড্রয়ার থেকে চাবির রিং, আইডি কার্ড আর নোটপ্যাডটা ব্যাগে ভরল। যাওয়ার আগে শেষবার মনিটরটার দিকে তাকাল।
ফ্ল্যাট সিক্স-বি’র উইন্ডোটা এখনো খোলা।
ঘরটা ফাঁকা। সাদা কার্পেটের ওপর রক্তের দাগটা ক্লিনিং এজেন্সির লোকেরা এসে পরিষ্কার করে গেছে। রকিং চেয়ারটা স্থির হয়ে আছে, টিভিটা বন্ধ।
স্ক্রিনের এক কোণায় একটা নোটিফিকেশন ব্লিংক করছে:
Subscription Status: Cancelled by User. Reason: Service no longer required.
রিয়ান অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামল। বাইরে কারওয়ান বাজারের তীব্র রোদ আর গাড়ির হর্নের শব্দ।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে সে তার মায়ের নাম্বার ডায়াল করল। মা গ্রামে একা থাকেন। গত মাসে রিয়ান মাকে বলেছিল, "আম্মা, তোমার তো বয়স হচ্ছে। আমি ঢাকায় ব্যস্ত থাকি, তোমার ঘরে একটা ক্যামেরা লাগায়ে দিই? আমি অফিস থেকেই তোমারে দেখতে পারব।"
ওপাশ থেকে মায়ের গলা শোনা গেল, "রিয়ান? নাস্তা করছিস বাবা?"
রিয়ান ফুটপাতের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকাল। কাল রাতে ধুয়ে ফেলার পরও নখের কোণায় একটুখানি শুকনো রক্ত লেগে আছে।
সে ঢোক গিলে বলল, "আম্মা, আমি সামনের সপ্তাহে বাড়ি আসতাসি। না, ছুটি না। এমনিই। তোমার কাছে থাকব কয়দিন।"
'সাবস্ক্রিপশন'
না লেখা গল্প-০৪
২১-১০-২৬





