মুষ্টির চাল

মুষ্টির চাল

বারোটা প্লাস্টিকের বাটিতে বারো রকম লবণ।

কাচের দেয়ালের ওপাশে ছয় থেকে বারো বছর বয়সী বারোজন শিশু বসে আছে, প্রত্যেকের পাশে মা।

প্রত্যেকের সামনে একটা ছোট কাগজের প্লেট, তাতে কয়েকটা চিপস আর একটা কার্ড যেখানে পাঁচটা মুখ আঁকা। খুব রাগী মুখ থেকে খুব খুশি মুখ। পছন্দের মুখে টিক দিতে হবে।

প্রত্যেক শিশু অংশ নেওয়ার জন্য পাবে পাঁচশো টাকা আর এক ব্যাগ চিপস।

নাজিয়া কাচের এপাশে দাঁড়িয়ে নিজের ট্যাবে সংখ্যাগুলো দেখছিল। একত্রিশ বছর বয়স নাজিয়ার, খাদ্যবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষে এখন তেজগাঁওয়ের একটা বহুজাতিক স্ন্যাকস কোম্পানির সিনিয়র ফ্লেভার সায়েন্টিস্ট।

গত ছয় মাস ধরে সে একটা নতুন চিপস নিয়ে কাজ করছে। প্রজেক্টের অভ্যন্তরীণ নাম “খেতে থাকো বাবুরা!”

নামটা সে নিজে দেয়নি। মিটিংয়ে মার্কেটিংয়ের এক ছেলে মজা করে বলেছিল, তারপর সবাই সেটাই বলতে শুরু করেছে।

ফ্লেভারের দুনিয়ায় একটা শব্দ আছে, “ব্লিস পয়েন্ট”, ভাবছিল নাজিয়া। লবণ, চিনি আর চর্বির এমন একটা নির্দিষ্ট মিশ্রণ যেটা পেলে মানুষের জিভ সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। এর কম হলে খাবারটা পানসে লাগে, বেশি হলে বিরক্ত লাগে। ঠিক ওই বিন্দুতে খাবারটা বানাতে পারলে মস্তিষ্ক আর খাওয়া থামাতে চায় না।

আমেরিকায় এক মনোবিজ্ঞানী কয়েক দশক ধরে বড় বড় খাদ্য কোম্পানির জন্য এই বিন্দু খুঁজে দিয়েছেন। কোমল পানীয়, সস, চিপস। নাজিয়া তাঁর পদ্ধতি পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর এখন রোজ ব্যবহার করছে।

আরেকটা কৌশলও আছে যেটা নিয়ে সে আগে কখনো ভাবেনি। কিছু চিপস মুখে দিলে প্রায় সাথে সাথে গলে যায়। জিভ টের পায় না যে কিছু খাওয়া হয়েছে। মস্তিষ্ক ক্যালরির হিসাব রাখতে পারে না, তাই পেট ভরার সংকেত আসে না। শিল্পের ভাষায় এর একটা ভদ্র নাম আছে। নাজিয়ার ল্যাবের দেয়ালে একটা চার্ট ঝোলানো, তাতে লেখা কোন তাপমাত্রায় ভাজলে কতটা দ্রুত গলে।

কাচের ওপাশে সাত নম্বর বাটির চিপস খাচ্ছিল একটা মেয়ে, বয়স সাত কি আট। প্লেটের সবগুলো চিপসের গুড়ো চেটেপুটে শেষ করে মায়ের প্লেটের দিকে হাত বাড়াল। মা হেসে হাত সরিয়ে দিলেন। মেয়েটা কার্ডে সবচেয়ে খুশি মুখটায় টিক দিল।

নাজিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার জুনিয়র, তানজিলা। সে ফিসফিস করে বলল, “আপা, সেভেন। দেখছেন? প্লেট শেষ তারপরও আবার চাইছে। এটাই আমাদের ফর্মুলা মনে হয়!”

নাজিয়া ট্যাবলেটে সাত নম্বর বাটির পাশে একটা তারকা দিল। আর ঠিক তখনি ওর টেবিলে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল, স্ক্রিনে আম্মার নাম্বার। কী ব্যাপার! মিটিংয়ের মাঝখানে তো আম্মা কখনো ফোন করেন না!

“তোর নানুর স্ট্রোক হইসে শেষ রাতে। ময়মনসিং মেডিকেলে এখন। আমি রওনা দিতেসি।”

নানু বাঁচলেন কিন্তু ডান দিকটা প্রায় অচল হয়ে গেল, সাথে অস্পষ্ট হয়ে গেল মুখের কথা। ডাক্তার বললেন, ফিজিওথেরাপি লাগবে, ঢাকায় নিয়ে যান, ভালো ভালো সেন্টার আছে। মামারা সবাই বিদেশে। আম্মার ফ্ল্যাট তিনতলায়, লিফট নেই। নাজিয়ার ফ্ল্যাট ধানমন্ডিতে, আট তলায়, লিফট আছে। সিদ্ধান্তটা কী হওয়া উচিৎ তা কাউকে মুখে বলতে হলো না।

দুই

নানু এলেন এক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। সাথে দুইটা টিনের ট্রাঙ্ক, একটা চটের ব্যাগ, আর একটা মাটির হাঁড়ি যেটার গলা পর্যন্ত মুখ বাঁধা পুরনো শাড়ির পাড় দিয়ে। আম্মা হাঁড়িটা দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন, “এইটা আনার কী দরকার ছিল, আম্মা?”

নানু কিছু বললেন না। বলতে পারতেন না। শুধু বাঁ হাতটা হাঁড়ির গায়ে রাখলেন যেভাবে মানুষ ঘুমন্ত শিশুর গায়ে হাত রাখে।

নাজিয়া তখনো জানতো না এই ছোট্ট হাঁড়িটা তাকে কত গভীর এক রহস্যের সম্মুখীন করবে!!

রান্নাঘরটা ছোট আর ঝকঝকে, নাজিয়ার যেমনটা পছন্দ। একটা ইন্ডাকশন চুলা, একটা মাইক্রোওয়েভ আর একটা এয়ার ফ্রায়ার যেটা সে শখের বশে কিনলে এখনো একবারও ব্যবহার করেনি। ফ্রিজে ফ্রোজেন পরোটা, সসের বোতল, কয়েকটা প্যাকেটের স্যুপ, অফিসের দেওয়া চিপসের কার্টন। গত দুই বছরে সে রান্না করেছে বড়জোর দশবার। খাবার আনে অ্যাপে অর্ডার করে অথবা অফিসের ক্যান্টিন থেকে।

প্রথম সকালে নাজিয়া ঘুম থেকে উঠে দেখল নানু রান্নাঘরের মেঝেতে বসে আছেন। একটা হাতে ভর দিয়ে কীভাবে বিছানা থেকে এতদূর এসেছেন সে বুঝতে পারল না। সামনে মাটির হাঁড়িটা, মুখ খোলা। নানু বাঁ হাতটা হাঁড়িতে ঢুকিয়ে এক মুঠো চাল তুললেন। তারপর পাশে রাখা একটা ছোট স্টিলের কৌটায় ঢাললেন। তারপর নাজিয়ার দিকে তাকালেন।

নাজিয়া দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় ময়মনসিংহের বাড়িতে সে এটা দেখেছে। প্রতিবার ভাত রান্নার আগে নানু এক মুঠো চাল আলাদা করে রাখতেন একটা আলাদা হাঁড়িতে। মাসের শেষে সেই চাল যেত মসজিদে কিংবা পাশের বাড়ির বিধবা খালার কাছে অথবা দরজায় আসা কোনো ভিক্ষুকের ঝোলায়। নাজিয়া কখনো জিজ্ঞেস করেনি কেন। ব্যাপারটা ছিল দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দের মতো, এতই স্বাভাবিক যে কেউ খেয়াল করে না।

নানু ভাঙা গলায় কিছু একটা বললেন। দুইটা শব্দ, জড়ানো। নাজিয়া প্রথমে বুঝল না। নানু আবার বললেন, প্রতিটা অক্ষর যেন পাথর ঠেলে বের করছেন।

“মুষ্টি… চাল।”

তারপর বাঁ হাত দিয়ে চুলার দিকে ইশারা করলেন। ভাত রাঁধ।

নাজিয়া শেষ কবে ভাত রেঁধেছে, মনে করতে পারল না। ইউটিউবে একটা ভিডিও খুলে, মাপের কাপ দিয়ে চাল মেপে, ফোনে টাইমার দিয়ে সে ভাত রাঁধল। নানু পুরো সময়টা মেঝেতে বসে দেখলেন। ভাত হলো একটু নরম, তলায় একটু লেগেও গেল। নানু বাঁ হাতে এক লোকমা মুখে দিলেন, অনেকক্ষণ ধরে চিবালেন, তারপর মাথা নাড়লেন। চোখে কী ছিল নাজিয়া বুঝতে পারল না। সন্তুষ্টি না। অসন্তুষ্টিও না। হয়তো ধৈর্য।

সেদিন অফিসে যাওয়ার আগে নাজিয়া রান্নাঘরের কাউন্টারে চোখ রাখল। মাটির হাঁড়ির পাশে স্টিলের কৌটা, তাতে এক মুঠো চাল।

তার বাসায় এই প্রথম কোনো খাবার দেখলও যেটা কেউ খাওয়ার জন্য রাখেনি, রেখেছে দেওয়ার জন্য।

তিন

দ্বিতীয় সপ্তাহে নানু তরকারি রাঁধতে চাইলেন।

তিনি নিজে পারতেন না, ডান হাত নড়ে না। তাই রান্নাঘরের মেঝেতে একটা পিঁড়িতে বসতেন আর বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেন। কতটা পেঁয়াজ, কতটা হলুদ, কখন ঢাকনা দিতে হবে। নাজিয়া মাপের চামচ খুঁজলে নানু বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়তেন, তারপর নিজের বাঁ হাতের তালু দেখাতেন। হাতে মাপো।

প্রথম যেদিন আলু দিয়ে মুরগির ঝোল হলো, নানু চুলার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। শেষে দুইটা শব্দ বোঝা গেল।

“পানি… বাড়া।”

নাজিয়া ভাবল তরকারি বেশি ঘন হয়ে গেছে। এক কাপ পানি দিল। নানু আরেকটা কাপের দিকে ইশারা করলেন। তারপর আরেকটা। তারপর দরজার দিকে। তারপর দুইটা আঙুল তুললেন, তারপর তিনটা।

নাজিয়া বুঝল না। নানু হতাশ হয়ে চোখ বন্ধ করলেন, তারপর আবার খুললেন, তারপর রান্নাঘরের তাক থেকে বাঁ হাতে তিনটা বাটি নামিয়ে মেঝেতে রাখলেন। তারপর আবার দরজার দিকে ইশারা করলেন।

নাজিয়া এবার বুঝল। এবং বুঝে লজ্জা পেল কারণ যে কাজটা নানু চাইছেন, সেটা ময়মনসিংহে সে ছোটবেলায় রোজ করেছে। রান্না হলে এক বাটি তরকারী দিয়ে আসা পাশের বাড়িতে। কোনো উপলক্ষ লাগত না, দাওয়াত লাগত না। ঝোলে একটু পানি বেশি দিলেই আরেকটা বাটি হয়ে যায়।

কিন্তু সমস্যা হলো, নাজিয়া তার প্রতিবেশীদের চেনে না। দুই বছর এই বিল্ডিংয়ে আছে। আট তলায় চারটা ফ্ল্যাট। লিফটে মাঝে মাঝে দেখা হয়, মাথা নাড়া হয়। এইটুকুই।

সেদিন সন্ধ্যায় সে তিনটা স্টিলের বাটিতে ঝোল নিয়ে প্রথম দরজায় বেল দিল, আর কী বলবে ভেবে না পেয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। দরজা খুললেন মাঝবয়সী এক মহিলা, মাথায় ওড়না, পেছনে টিভিতে সিরিয়াল চলছে।

নাজিয়া বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমার নানু… মানে, আমার নানু আমার সাথে থাকছেন। উনি বললেন… মানে, আমরা রান্না করেছিলাম…”

মহিলা বাটিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন কেউ তাঁর হাতে একটা পার্সেল বোমা দিয়েছে। তারপর হঠাৎ তাঁর মুখটা অন্যরকম হয়ে গেল।

“তোমার নানু কি ময়মনসিংহের?”

“জি।”

“আমার মাও ময়মনসিংহের।” তিনি বাটিটা নিলেন, দুই হাতে। “বিশ বছর ঢাকায় আছি, কেউ কোনোদিন বাটি দিয়ে যায় নাই।”

দ্বিতীয় দরজায় থাকেন এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, একা। স্ত্রী মারা গেছেন, ছেলেমেয়ে কানাডায়। একা থাকা একজন পুরুষের দরজায় রাতে বেল দিতে নাজিয়ার সংকোচ হলো। সে বাটিটা দারোয়ান চাচার হাতে দিয়ে পাঠাল। চাচা ফিরে এসে বললেন, “স্যার কিছু কন নাই। খালি বাটিটা হাতে লইয়া অনেকক্ষণ দরজায় খাড়াইয়া আছিলেন। তারপর জিগাইলেন, পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটার নানুর কী অসুখ।”

তৃতীয় দরজায় এক তরুণ দম্পতি, দুজনেই চাকরি করে। দরজা খুলল বউটি, হাতে ডেলিভারির খাবারের প্যাকেট।

পরদিন সকালে নাজিয়ার দরজায় তিনটা বাটি ফেরত এলো। একটাও খালি না। একটায় চালের রুটি আর হাঁসের মাংস। একটায় কয়েকটা কমলা। আর অধ্যাপক সাহেবের বাটিটা পরিষ্কার করে ধোয়া, মাঝে একটা ভাঁজ করা চিরকুট। “আপনার নানুর দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। কোনো দরকার হলে দারোয়ানকে দিয়ে খবর দেবেন। আমি সারাদিন বাসায় থাকি।”

নাজিয়ার মনে পড়ল নানু একটা নিয়ম মানতেন। কারো বাটি খালি ফেরত দিতে নেই। কিছু না থাকলে অন্তত এক মুঠো চিনি, দুইটা লবঙ্গ, একটা পান। ও ভেবেছিল নিয়মটা এখন আর নেই কোথাও, আছে ঠিকই শুধু কেউ বাটিটা পাঠানোর অপেক্ষায় চুপ করে ছিল!

রাতের বেলা কী মনে করে নাজিয়া নানুর সেই দুইটা শব্দ লিখে ইন্টারনেটে খুঁজে মুসলিম শরিফের একটা হাদিস পেল। আবু যর গিফারীকে নবীজি বলেছিলেন, যখন তুমি তরকারি রাঁধবে তাতে পানি বাড়িয়ে দাও আর তোমার প্রতিবেশীর খোঁজ নাও। নানু কখনো এই হাদিস মুখে বলেননি। নাজিয়ার ধারণা, নানু হয়তো হাদিসটা জানতেনও না। শুধু তাঁর মা জানতেন, অথবা তাঁর মায়ের মা। কথাটা শুনতে শুনতে কোনো এক প্রজন্মে কথা আর কথা থাকেনি, হয়ে গিয়েছিল অভ্যাস।

চার

অফিসে নাজিয়া খেয়াল করল সে বদলে যাচ্ছে। এবং পরিবর্তুনটা তার ভালো লাগছিল না কারণ এতে তার কাজ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।

দুপুরে ক্যান্টিনে বসে তার একটা গবেষণার কথা মনে পড়ল, ২০১৯ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথে একদল গবেষক কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে একটা ক্লিনিকে রেখেছিলেন। দুই সপ্তাহ তাঁরা খেয়েছেন কারখানায় তৈরি প্রক্রিয়াজাত খাবার, আরও দুই সপ্তাহ প্রায় অপ্রক্রিয়াজাত খাবার। যত খুশি খাওয়ার সুযোগ ছিল।

প্রক্রিয়াজাত খাবারের সপ্তাহগুলোতে তাঁরা গড়ে দিনে প্রায় পাঁচশো ক্যালরি বেশি খেয়েছিলেন। কেউ টেরও পাননি কিন্তু ওজন সেভাবেই বেড়েছিল।

'কেউ টেরও পাননি' নাজিয়া এই অংশটায় এসে আটকে গেল। এই টের না পাওয়াটাই তো তার চাকরি...

বাসায় নানু খেতেন খুব ধীরে। পেট ভরার আগেই থেমে যেতেন। একদিন নাজিয়া জিজ্ঞেস করেছিল, “নানু, আরেকটু দিই?” নানু নিজের পেটে বাঁ হাত রেখে তিনটা আঙুল দেখিয়েছিলেন, তারপর একটা আঙুল নামিয়ে আনলেন। তিন ভাগের এক ভাগ।

পরে নাজিয়া এটাও খুঁজে পেয়েছিল, তিরমিজির হাদিসে। পেটের এক ভাগ খাবারের, এক ভাগ পানির, এক ভাগ নিঃশ্বাসের। আর এটা আসলে সর্বোচ্চ, নবীজি বলেছেন পিঠ সোজা থাকে এতটুকু খেলেই যথেষ্ট!

অথচ তার ল্যাবের পুরো কাজ ছিল ঠিক উল্টো। কেউ যেন খাওয়া না থামায়, থামাতে না পারে...

পাঁচ

সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপারটা ঘটলো শুক্রবার রাতে।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে রান্নাঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নাজিয়া মাটির হাঁড়িটার দিকে তাকাল। তারপর বিদ্যুৎ চমকের মত একটা ব্যাপার মাথায় এলো যেটা সে এতদিন খেয়ালই করে নি!

নানু এসেছেন পাঁচ সপ্তাহ আগে। হাঁড়িটা তখন মোটামুটি অর্ধেক ভরা ছিল। নাজিয়া এরমধ্যে একবারও চাল কেনেনি। প্রতিদিন দুই বেলা ভাত হয়েছে, প্রতিবার এক মুঠো আলাদা হয়েছে, প্রতিবেশীদের বাটিতে মাঝে মাঝে ভাতও গেছে।

খাদ্যবিজ্ঞানীর মাথা আপনা থেকেই হিসাব করে ফেলল। এতদিনে অন্তত দশ-পনেরো কেজি চাল খরচ হওয়ার কথা। একটা মাঝারি মাটির হাঁড়িতে অর্ধেক ভরলে তো এর অর্ধেকও ধরে না।

অথচ হাঁড়িটা এখনো অর্ধেক ভরা! কীভাবে সম্ভব!!

সে আম্মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল, কেউ চাল এনে দিয়েছে কি না। আম্মা অবাক হলেন। না তো। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করল। না। অধ্যাপক সাহেব, আট তলার আন্টি, কেউ না।

নাজিয়া একটা পেন্সিল নিয়ে হাঁড়ির ভেতরের দেয়ালে চালের ঠিক ওপরে একটা সরু দাগ টানল।

দু'দিন পর দাগটা তখনো চালের ঠিক ওপরে ছিল। চাল এক চুলও নামেনি।

নানু সেদিন পিঁড়িতে বসে থেকে তাকে দাগটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলেন। কিছু বললেন না। শুধু চোখ দুটো একটু সরু হলো, যেভাবে মানুষ কাউকে এমন কিছুর কাছাকাছি যেতে দেখে, যেটা ছুঁলে ভেঙে যেতে পারে।

নাজিয়া সেটা খেয়াল করেছিল। এবং খেয়াল করেও সে পরের দিন অফিস থেকে ল্যাবের ডিজিটাল স্কেলটা ব্যাগে ভরে নিয়ে এলো।

চালের মাপ স্কেলটা দেখাল ছয় কেজি দুইশো চল্লিশ গ্রাম।

নাজিয়া হাঁড়িটা খালি অবস্থায় আলাদা মেপে নিয়েছিল, চাল সাবধানে একটা বড় গামলায় ঢেলে তারপর আবার ফিরিয়ে। ল্যাবের অভ্যাস। একটা মাস্কিং টেপের টুকরায় মার্কার দিয়ে লিখল তারিখ আর ওজন, তারপর হাঁড়ির গায়ে সেঁটে দিল। ঠিক যেভাবে অফিসে প্রতিটা নমুনার গায়ে লেবেল লাগায়।

নানু পিঁড়িতে বসে পুরোটা দেখলেন।কোন বাধা দিলেন না।

আর তার ঠিক পর দিন থেকে চাল কমতে শুরু করল।

একদম স্বাভাবিকভাবে। ঠিক যতটা কমার কথা।

দিনে দুই বেলার ভাত, দুই মুঠো আলাদা, মাঝে মাঝে প্রতিবেশীর বাটি। নাজিয়া প্রতি রাতে ওজন নিত, টেপের নিচে নতুন লাইন লিখত। সংখ্যাগুলো একটা নিখুঁত সরলরেখায় নামছিল, যেমন তার ল্যাবের কোনো ভালো পরীক্ষায় নামে। বারো দিনের মাথায় হাঁড়ির তলা দেখা গেল।

তেরো দিনের দিন সকালে নাজিয়া মোহাম্মদপুরের বাজার থেকে প্রথমবারের মতো চাল কিনে আনল। পঁচিশ কেজির বস্তা। রিকশা থেকে নামিয়ে লিফটে তুলতে তুলতে তার মনে হচ্ছিল সে কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু ঠিক কী হারিয়েছে তা বুঝতে পারছিল না।

সেই রাতে সে নানুর পাশে বসেছিল। নানু টেপের লেবেলটার দিকে বাঁ হাতে ইশারা করলেন। তারপর নাজিয়ার দিকে তাকালেন। মুখের বাঁ দিকটা একটু বেঁকে গেল। হাসি। রাগ নেই, অভিমান নেই। যেভাবে কেউ বাচ্চাকে প্রথমবার আগুন ছুঁয়ে হাত পোড়াতে দেখে হাসে। এবার বুঝলি তো?

নাজিয়া অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিল। নানা রকম ব্যাখ্যা খুঁজতে খুঁজতে শেষে বুখারী শরিফের একটা হাদিস পেল যেটা পড়ে সে ফোনটা রেখে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, নবীজি যখন ইন্তেকাল করলেন, তখন আমার ঘরে তাকের ওপর সামান্য কিছু যব ছিল। আমি অনেকদিন সেখান থেকে খেয়েছি। তারপর একদিন মেপে দেখলাম। তারপর তা শেষ হয়ে গেল।

তারপর একদিন মেপে দেখলাম। তারপর তা শেষ হয়ে গেল।

নাজিয়া এই লাইনটা কয়েকবার পড়ল।

তার পুরো পেশাগত জীবন মাপার ওপর দাঁড়িয়ে। গ্রাম, মিলিগ্রাম, ক্যালরি, বাচ্চাদের মুখের অভিব্যক্তি এক থেকে পাঁচের স্কেলে। সে মাপতে ভালোবাসে এবং জানে মাপা খারাপ কিছু না। কোরআনে সূরা মুতাফফিফিন শুরুই হয়েছে মাপে কম দেওয়াদের ধ্বংসের কথা দিয়ে। ব্যবসায় মাপ ঠিক রাখা ইবাদত।

কিন্তু সেই রাতে সে একটা পার্থক্য প্রথমবার স্পষ্ট অনুভব করতে পারল।

মানুষকে যা দিচ্ছ, তা পুরো মেপে দাও। আর আল্লাহ তোমাকে যা দিচ্ছেন, তা সবসময় মাপার দরকার নেই...

অথচ তার প্রফেশনাল দুনিয়া এই দুইটাকে উল্টে ফেলেছে, ওরা মানুষকে যা দেয়, সেখানে মাপ লুকানোটাই নর্ম। বাচ্চাদের চিপসের প্যাকেটে লবণের পরিমাণ এত ছোট অক্ষরে লেখা যে কোনো মা তা পড়েও দেখে না।

আর ওর নিজের যা আছে সেখানে প্রতিটা দানা গোনে বারবার। ব্যাংক ব্যালেন্স, ক্যালরি, স্টেপ কাউন্ট, ফলোয়ার।

আর যে জিনিস প্রতি মুহূর্তে গোনা হয়, তাতে বরকত থাকার জায়গাটাই থাকে না...

ছয়

তিন সপ্তাহ পর “খেতে থাকো বাবুরা!” প্রজেক্টের চূড়ান্ত অনুমোদনের মিটিং।

নাজিয়া স্লাইড বানিয়েছিল তিন রাত জেগে। কিছু প্রস্তাব ছিল তাতে। লবণ ব্লিস পয়েন্ট থেকে পনেরো শতাংশ নামানো, টেক্সচার বদলানো, যাতে চিপস মুখে গলে না গিয়ে একটু চিবাতে হয়, যাতে মস্তিষ্ক টের পায় খাওয়া হচ্ছে। প্যাকেট ছোট করা। আর প্রজেক্টের নামটা বদলানো।

রিজিওনাল ডিরেক্টর পুরো প্রেজেন্টেশন মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, “নাজিয়া, তুমি আমাদের সবচেয়ে ভালো সায়েন্টিস্টদের একজন তাই তোমাকে উত্তর দেয়ার সুযোগ দিচ্ছি নয়তো এত ইম্প্র্যাক্টিকাল প্রপোজাল আমি গ্রাহ্য ও করতাম না। বলো, আমরা যদি এই চিপস বাজারে না আনি ওই সাত বছরের মেয়েটা দশ টাকা দিয়ে কী কিনবে?”

নাজিয়া জানত উত্তরটা, হয়তো বাজারের দোকানের তেলে ভাজা কিছু যে তেল সপ্তাহে একবার বদলানো হয়, যদি হয়।

“আমাদের চিপসে অন্তত ভিটামিন এ আর আয়রন মেশানো আছে,” তিনি বলে চললেন। “ফুড সেফটির প্রতিটা মানদণ্ড মানা হয়েছে। আর আমরা লবণ কমালে, প্রতিযোগীর চিপস ওই মেয়েটার কাছে বেশি মজা লাগবে, সে ওটাই কিনবে, তাতে ভিটামিনও নেই। তুমি ভালো কিছু করতে চাইছ বুঝলাম। কিন্তু তোমার ভালোটা বাজারে টিকবে না, আর যেটা টিকবে না, সেটা কারো ভালো করতেও পারে না।”

নাজিয়া উত্তর দিতে পারত। বলতে পারত, ভিটামিন মেশানোর কথা বলে বাকি ক্ষতিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বলতে পারত, সাত নম্বর বাটির মেয়েটা মায়ের প্লেটের দিকে হাত বাড়িয়েছিল, এটাই তাদের সাফল্যের মাপকাঠি অথচ এমনটা তো হওয়া উচিৎ না। কিন্তু ও কিছুই বলল না, ও ভালো মতই জানে, এই ঘরের কেউ আসলে সেই অর্থে খারাপ মানুষ না।

ডিরেক্টর নিজে দুই সন্তানের বাবা, প্রতি রমজানে অফিসের সবাইকে নিয়ে এতিমখানায় ইফতার করান। দোষটা আসলে এদের না। দোষটা সিস্টেমের। যে সিস্টেমে প্রতিযোগিতাই সব, বিক্রি আর লাভটাই একমাত্র সাফল্য। যে সিস্টেমে পেটের তিন ভাগের এক ভাগ খালি রাখার কোন সুযোগই নেই!

ভিটামিন থাকল। লবণ থাকল ব্লিস পয়েন্টে। টেক্সচারের অনুমোদনপত্রে নাজিয়া সই করতে অস্বীকার করল। ডিরেক্টর কোনো রাগ দেখালেন না। কাগজটা তানজিলার দিকে ঠেলে দিলেন। তানজিলা এক মুহূর্ত নাজিয়ার দিকে তাকাল, তারপর সই করল।

পরের মাসে নাজিয়া স্কুল-টিফিন প্রকল্পে বদলির আবেদন করল। কোম্পানির ছোট একটা বিভাগ, সরকারের সাথে যৌথ কাজ, গ্রামের স্কুলে দুপুরের খাবারের পুষ্টি নিয়ে। বেতন একই, পদোন্নতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

আবেদন মঞ্জুর হলো। কেউ আটকাল না। হয়তো সবাই একটু স্বস্তিই পেল।

নানু লাঠিতে ভর দিয়ে নিজের পায়ে হেঁটে অ্যাম্বুলেন্সে উঠে ময়মনসিংহে ফিরে গেলেন তিন মাস পর। ডান হাত এখনো পুরো নড়ে না কিন্তু কথা অনেকটাই ফিরেছে। যাওয়ার আগে তিনি মাটির হাঁড়িটা নাজিয়ার রান্নাঘরেই রেখে গেলেন। গলায় সেই পুরনো শাড়ির পাড়টা জড়ানো। নাজিয়া মনে করিয়ে দিতে গেলে নানু মাথা নাড়লেন।

“থাউক। ঐটা তোর।”

মুষ্টির চাল

না লেখা গল্প-০৬

২৫-১০-২৬

Share This Post

Related Blog

অস্পৃশ্য

অস্পৃশ্য

সকালের নাশতার টেবিলে গরম চায়ের কাপটা ধরতে গিয়ে আমি ব্যাপারটা প্রথম টের পেলাম। কেন যেন ডান হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ডগায় কোন অনুভূতি নেই। কাপটা হাত ...
পিঁপড়ের লাইন

পিঁপড়ের লাইন

৪ জানুয়ারি, রবিবারএই ডায়েরিটা আমাকে আম্মু কিনে দিয়েছে। বলেছে প্রতিদিন লিখতে হবে, তাহলে বাংলা রচনায় হাত ভালো হবে। ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় র...
কাঁঠালতলা

কাঁঠালতলা

আইসিইউরাত তিনটা পঁয়তাল্লিশ।ছয় নম্বর বেডের বৃদ্ধ হুট করে চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলেন, “আযান হইসে?”প্রশ্নটা শুনে শাহেদের হাত এমনভাবে কেঁপে উঠল যে স্যালাইনে...