ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে নৌকার ইঞ্জিনটা যখন খকখক করে থেমে গেল, সূর্য তখন ডুবে গেছে।
মাঝি ছেলেটার বয়স বিশও হবে না। সে ইঞ্জিনের ঢাকনা খুলে টর্চের আলোয় কিছুক্ষণ খোঁচাখুঁচি করল। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে গলুইয়ে বসে বিড়বিড় করে দোয়া ইউনুস পড়তে লাগল। মাছের পেটের অন্ধকারে ইউনুস নবী যে দোয়া পড়েছিলেন।
আমি ফোনের দিকে তাকালাম। নেটওয়ার্ক নেই। জিপিএসের নীল বিন্দুটা ঘুরছে, অবস্থান ধরতে পারছে না। চারপাশে শুধু পানির ছলাৎ ছলাৎ, আর এমন অন্ধকার, যেমন অন্ধকার আমি জীবনে দেখিনি।
এবং ঠিক তখন, কোনো কারণ ছাড়াই, আমার নানির কথা মনে পড়ল।
নানির একটা নিয়ম ছিল। এশার পর বাতি নিভাতে হবে। ছোটবেলায় নানাবাড়িতে আমরা রাত জেগে লুডু খেলতে চাইতাম, নানি জায়নামাজ ভাঁজ করতে করতে সুইচে হাত রাখতেন।
“নিভাও। রাইতেরও একটা হক আছে।”
আমরা হাসতাম কিন্তু নানি রাগ করতেন না। অন্ধকারে শুধু তাঁর গলা শোনা যেত, “হাসো। একদিন বুঝবা।”
নানি মারা গেছেন বারো বছর। আমি এখন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রকৌশলী। সাত বছরে আমার হাত দিয়ে তিনশোর বেশি গ্রামে প্রথমবার বাতি জ্বলেছে। প্রথম বাল্ব জ্বললে বাচ্চারা যে হাততালি দেয়, ওই শব্দের চেয়ে পবিত্র শব্দ আমি খুব কম শুনেছি।
নানি হয়তো ঠিকই বলতেন। আলো আনতে গিয়ে আমরা এমন একটা জিনিস সাথে করে এনেছি, যেটা আনার দরকার ছিল না।
সে যাক, আজকে আসলে আমি নদীর মাঝখানে এসেছি একটা কালো ফোঁটার খোঁজে।
গতবছর সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, দেশের শতভাগ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। অফিসে মিষ্টি বিলানো হলো। দুই সপ্তাহ পর আমার টেবিলে এলো একটা স্যাটেলাইট ছবি। পৃথিবীর অর্থনীতিবিদরা এখন মহাকাশ থেকে রাতের আলো মেপে দেশের উন্নতি আন্দাজ করেন। যে এলাকা যত উজ্জ্বল, ধরে নেওয়া হয় সেখানে তত উন্নয়ন। মানে আমরা এমন একটা দুনিয়া বানিয়েছি, যেখানে একটা জাতির উন্নতির প্রমাণ হলো, সে রাতকে কতখানি হারিয়েছে।
ছবিতে কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাছে, ব্রহ্মপুত্রের বুকে, চারপাশের সব চর টিমটিম করে জ্বলছে। শুধু একটা জায়গা একদম কালো, যেন কেউ কালির ফোঁটা ফেলে দিয়েছে। কোনো মানচিত্রে নাম নেই, ইউনিয়নের তালিকায় নেই। বড় স্যার ফাইলের ওপর লাল কালিতে লিখে দিয়েছিলেন: শতভাগের মধ্যে কোনো ফুটো থাকা চলবে না।
চিলমারী ঘাটের বুড়ো মাঝিরা জায়গাটার নাম শুনে একে অন্যের দিকে তাকিয়েছিল। “নিশিরচর? দিনে যান, স্যার। রাইতে ওইদিকে কেউ যায় না। কেন যায় না, জানি না। বাপ-দাদায় যাইতো না, হামরাও যাই না।” শেষে বেশি টাকা দিয়ে এই ছেলেটাকে রাজি করিয়েছিলাম। আর এখন ইঞ্জিন বন্ধ, সূর্য ডুবে গেছে, আমরা রাতের ঠিক মাঝখানে।
মাঝি ছেলেটা হঠাৎ দোয়া থামিয়ে সোজা হয়ে বসল। “স্যার। ওইযে।”
অন্ধকার নদীর ওপর একটা হলুদ আলো। একটা হারিকেন। দূরের কোনো ঘাটে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, বাতিটা উঁচু করে ধরে। ছেলেটা ইঞ্জিনের দড়িতে আরেকবার টান দিল। এবার এক টানেই চালু হলো।
নৌকা যখন বালুতে ঠেকল, দেখলাম ঘাটে একটা কাঠের খুঁটি পোঁতা, তাতে একটা তক্তা। আলকাতরা দিয়ে হাতে লেখা কয়েকটা শব্দ, হারিকেনের আলোয় পড়া যায়।
নিশিরচর। এই চরে রাইত বেচা হয় না।
আমি লাইনটা দুইবার পড়লাম। আমি আলো বিলানোর মানুষ। জীবনে কখনো ভাবিনি রাত বেচা যায়।
হারিকেন হাতে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর বয়স সত্তরের ওপরে। লম্বা, শুকনা, সাদা দাড়ি, গায়ে একটা পুরনো চাদর। তিনি আমার মুখে বাতিটা তুলে ধরে অনেকক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, “তুমি বিজলির মানুষ।”
প্রশ্ন না। ঘোষণা।
“জি। আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
“তোমার চোখ আন্ধারে চোখ কুঁচকায়।” তিনি হাসলেন। “যারা আলো বেচে, তাগো চোখ আন্ধার সহ্য করতে পারে না। আইসো। তোমার লাইগা বাত্তি জ্বালাইয়া রাখছি।” তারপর একটু থেমে বললেন, “এশার পরে নিভামু।”
নানির কথা মনে পড়ল। বুকের ভেতর কী যেন একটা নড়ে উঠল।
“আপনার নাম?”
“সোবহান।” তিনি হাঁটা শুরু করলেন, হারিকেনের আলো বালুর ওপর দুলতে লাগল। “চরের মানুষ কয় সাঁঝের বুড়া। কারণ আমি সাঁঝের বাত্তি জ্বালাই, আর এশার বাত্তি নিভাই। পঞ্চাশ বছর ধইরা এই এক কাম।”
দুই
নিশিরচরে চল্লিশ-পঞ্চাশ ঘর মানুষ।
টিনের চাল, বাঁশের বেড়া, উঠানে মাটির চুলা। মাগরিবের পর প্রতিটা ঘরে একটা করে কুপি বা হারিকেন জ্বলল। রান্না হলো, খাওয়া হলো, বাচ্চারা উঠানে বসে নামতা পড়ল। এশার আজান হলো একটা টিনের মসজিদ থেকে, মাইক ছাড়া। খালি গলার আজান যে এতদূর যায়, আমি জানতাম না।
তারপর চরের সব বাতি নিভে গেল। একসাথে। কেউ কাউকে বলল না, কেউ চিৎকার করল না। যেভাবে সন্ধ্যায় পাখিরা নিজে নিজেই বাসায় ফেরে।
সোবহান চাচা আমাকে মসজিদের পাশে একটা ছোট ঘরে থাকতে দিয়েছিলেন। আমি চৌকিতে শুয়ে ফোন বের করলাম। নেটওয়ার্ক নেই, চার্জ বাইশ শতাংশ। স্ক্রিনের আলোটা জ্বালাতেই মনে হলো আমি অন্ধকার ঘরে একটা অশ্লীল কিছু করছি। ফোন বন্ধ করে দিলাম।
এবং তখন প্রথমবার আমি অন্ধকারটা দেখলাম।
আমি ঢাকার মানুষ। আমার জীবনে কখনো সত্যিকারের অন্ধকার আসেনি। বাসার জানালায় স্ট্রিটলাইট, ফ্রিজের লাল বাতি, রাউটারের সবুজ বাতি, পাশের বিল্ডিংয়ের সিঁড়ির আলো। আমি জানতাম না যে অন্ধকারেরও ঘনত্ব আছে, ওজন আছে। ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে কিছু একটা চকচক করছিল। আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
আকাশটা ভেঙে পড়ছিল।
আমি বাড়িয়ে বলছি না। মাথার ওপর দিয়ে এক কিনারা থেকে আরেক কিনারা পর্যন্ত একটা সাদাটে নদী বয়ে যাচ্ছিল, ধোঁয়ার মতো, দুধের মতো।
আমি বত্রিশ বছর বয়সে প্রথমবার নিজের চোখে ছায়াপথ দেখলাম। আর নিচে, ধানক্ষেতের ওপর, হাজার হাজার জোনাকি। একটা সময় বুঝতে পারছিলাম না কোনটা আকাশ আর কোনটা মাটি।
পরে ঢাকায় ফিরে খুঁজে দেখেছি। ২০১৬ সালে বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, পৃথিবীর আশি ভাগের বেশি মানুষ এমন আকাশের নিচে থাকে যেটা কৃত্রিম আলোয় দূষিত। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ জীবনে কোনোদিন ছায়াপথ দেখতে পায় না। আর জোনাকি কমে যাওয়ার বড় কারণগুলোর একটা এই কৃত্রিম আলো। জোনাকিরা আলো জ্বেলে একে অন্যকে ডাকে। শহরের আলোর ভিড়ে তারা আর নিজেদের ডাক খুঁজে পায় না।
আমরা পাই কি?
আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। পেছন থেকে সোবহান চাচার গলা এলো। “দেখলা?”
আমার গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।
“তোমাগো শহরের মানুষ আসমান হারাইছে,” তিনি আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। “কিন্তু খেয়াল করে নাই। মানুষ যেই জিনিস রোজ হারায়, সেইটা হারানোর কথা টের পায় না। তোমার নানা-দাদায় এই আসমান দেখত রোজ রাইতে। আসমান দেখলে মানুষ ছোট হয়, বুঝলা? নিজেরে ছোট দেখলে আল্লাহরে বড় দেখা যায়। আর মানুষ যখন রাইতেও নিজের বানানো আলো ছাড়া আর কিছু দেখে না, তখন সে নিজেরেই সবচেয়ে বড় মনে করে।”
সেই রাতে আমি ঘুমালাম এমন ঘুম, যেমন ঘুম শেষ কবে ঘুমিয়েছি মনে নেই।
এবং রাত আড়াইটার দিকে জেগে উঠলাম।
ভয়ে না, অস্বস্তিতেও না। পুরোপুরি সজাগ, পুরোপুরি শান্ত। যেন শরীর নিজে থেকে জানে, এখন জাগার সময়। বাইরে মৃদু শব্দ। আমি দরজা খুলে দেখলাম, পুরো চর জেগে আছে। শব্দ নেই, আলো নেই, কিন্তু জেগে আছে।
মসজিদে কয়েকজন তাহাজ্জুদ পড়ছে। এক উঠানে দুজন বুড়ি পাশাপাশি বসে খুব নিচু গলায় গল্প করছে। এক ঘরের দাওয়ায় এক স্বামী-স্ত্রী বসে আছে, কথা বলছে না, শুধু বসে আছে। দূরে কেউ আস্তে আস্তে কোরআন পড়ছে, মুখস্থ, আলো ছাড়া।
সোবহান চাচা মসজিদের সিঁড়িতে বসে ছিলেন। আমাকে দেখে হাসলেন। “পয়লা ঘুম শেষ?”
“পয়লা ঘুম?”
“বাপ-দাদায় দুই ঘুমে ঘুমাইতো। এশার পরে পয়লা ঘুম। মাঝরাইতে জাগনা। তারপর ফজরের আগে দুসরা ঘুম। মাঝখানের জাগনাটা আল্লার ভাগ। নবীজি কইছেন, রাইতের শেষ তিন ভাগের এক ভাগে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নাইমা আসেন, ডাকেন, কে আছো চাওয়ার, দেই। কে আছো মাফ চাওয়ার, মাফ করি।” তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। “তোমাগো শহরের মানুষ ঠিক ওই সময়টাতে কী করে কও তো?”
আমি জানতাম। আমি নিজেই করি। ঠিক ওই সময়টাতে আমি ফোনের আলোয় একটা ভিডিওর পর আরেকটা ভিডিও দেখি, ঘুম আসে না বলে। অথবা ঘুমের ওষুধ খেয়ে এমন ঘুম ঘুমাই, যেটা থেকে উঠে মনে হয় কেউ আমাকে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল।
ঢাকায় ফিরে আমি এটা নিয়েও পড়েছি। রজার একার্চ নামে এক মার্কিন ইতিহাসবিদ বছরের পর বছর পুরনো ডায়েরি, আদালতের নথি, চিঠি, ডাক্তারি বই ঘেঁটে দেখিয়েছেন, কারখানার যুগের আগে ইউরোপের মানুষ সাধারণত দুই ধাপে ঘুমাত। “প্রথম ঘুম” আর “দ্বিতীয় ঘুম”। মাঝখানে এক-দুই ঘণ্টা জেগে থাকত। প্রার্থনা করত, ভাবত, স্বপ্নের কথা বলত, প্রতিবেশীর সাথে গল্প করত।
তারপর রাস্তায় গ্যাসের বাতি এলো, কারখানায় শিফট এলো, ঘরে বিজলি এলো, আর এক-দুই প্রজন্মের মধ্যে মানুষ এই মাঝখানের সময়টার কথা ভুলেই গেল। এখন মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই। ভাবি, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।
হয়তো হয়েছে। শুধু গোলমালটা আমাদের ঘুমে না।
“তোমাগো দোষ দেই না,” সোবহান চাচা বললেন, যেন আমার মনের কথা পড়েছেন। “তোমাগো রাইতটা কেউ কিনা লইছে। তুমি টের পাও নাই কখন বেচছো।”
“কে কিনেছে, চাচা?”
“যার কাম রাইত বারোটায়ও খোলা থাকে।” তিনি আঙুলে গুনতে লাগলেন। “কারখানা, যেইখানে মাইয়ারা রাইতের শিফটে সেলাই করে। দোকান, যেইটা চব্বিশ ঘণ্টা খোলা। মোবাইল, যেইটা বালিশের পাশে শুইয়া তোমারে জাগাইয়া রাখে, কারণ তুমি যত জাগো, তার তত লাভ। আগে মানুষের রাইত আছিল মানুষের। এখন মানুষের রাইত হইলো বাজারের সবচাইতে সস্তা মাল। সবাই কিনতে চায়, কেউ দাম দিতে চায় না।”
আমার পেশাগত মনটা জেগে উঠল। “কিন্তু চাচা, মানুষ তো নিজেই চায়। কেউ জোর করে না।”
“জোর করে না,” তিনি মাথা নাড়লেন। “ডাকে। জোনাকি যেমন বাত্তি জ্বালাইয়া ডাকে, তেমন ডাকে। খালি জোনাকি ডাকে সঙ্গীরে। এরা ডাকে খরিদ্দারেরে।” একটু থেমে বললেন, “কোরআনে আল্লাহ একটা সওয়াল করছেন, জানো? সূরা কাসাসে। কও তো, আল্লাহ যদি কেয়ামত পর্যন্ত দিনরে চিরস্থায়ী কইরা দেন, তাইলে আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ আছে যে তোমাগো রাইত আইনা দিবো, যেইখানে তোমরা আরাম করবা? তোমরা কি দেখো না?” সোবহান চাচা চুপ করে রইলেন।
“চৌদ্দশো বছর আগে এই সওয়াল শুইনা মানুষ ভাবছে, এইটা তো হইতেই পারে না। কে দিনরে চিরস্থায়ী করবো? আর এখন দেখো। মানুষ নিজেই নিজের লাইগা চিরস্থায়ী দিন বানাইয়া লইছে। আর রাইত ফেরত দেওয়ার কেউ নাই।”
আমি আর কিছু বললাম না। আমার মাথায় একটা হিসাব চলছিল। চোখে আলো পড়লে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন হরমোন কম বানায়। এই হরমোন শরীরকে জানায়, এখন রাত, এখন মেরামতের সময়। বিশেষ করে নীলচে আলো, যেমন ফোন আর এলইডির আলো, এই সংকেত সবচেয়ে বেশি থামিয়ে দেয়।
আমি সাত বছর ধরে তিনশো গ্রামে এলইডি বাল্ব লাগিয়েছি। স্ট্রিটলাইট লাগিয়েছি। সেগুলোর গায়ে লেখা থাকত, “সারারাত জ্বলবে।” আমরা এটাকে বলতাম সাফল্য।
পরদিন সকালে আমার সাথে দেখা হলো নূরজাহানের।
চরের একমাত্র স্কুলটা একটা টিনের ঘর। সামনে বাঁশের খুঁটিতে জাতীয় পতাকা। নূরজাহান সেখানকার শিক্ষিকা। চিলমারী কলেজ থেকে বিএ পাস, চরের প্রথম মেয়ে যে কলেজে গিয়েছে। আমি বিদ্যুতের লোক শুনে সে স্কুলের বারান্দা থেকে সোজা আমার দিকে হেঁটে এলো।
“আপনি বিজলি আনবেন?”
“জরিপ করতে এসেছি।”
“আনবেন কি না, সেইটা কন।” তার গলায় কোনো ভণিতা নেই। “আর চরের বুড়াগো গল্প শুইনা মনে মনে যদি ভাবেন, আহা, কী সুন্দর আন্ধার, কী শান্তি, তাইলে সেই কথা আমার সামনে কইয়েন না।”
আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, “আমার মা মরছে আমারে জন্ম দিতে গিয়া। রাইতে। হারিকেনের আলোয় দাই কিছু দেখতে পায় নাই, রক্ত কোনখান থেইকা আসতেছে। চিলমারী নেওয়ার লাইগা নৌকা খুঁজতে গেছিল, আন্ধারে নৌকা ছাড়ে নাই।” সে এক মুহূর্তও থামল না।
“আমার স্কুলের মাইয়ারা কুপির আলোয় পড়ে, পনেরো বছর বয়সে চশমা লাগে। আপনারা শহরের মানুষ আন্ধার দেখতে আসেন শখে, দুই রাইত থাইকা ছবি তুইলা ফেরত যান। আমরা থাকি সারাজীবন।”
আমি মাথা নিচু করলাম। সে পুরোপুরি ঠিক বলছিল। আমার গতরাতের মুগ্ধতার একটা বড় অংশ ছিল পর্যটকের মুগ্ধতা। যে মানুষ জানে সে ফিরে যেতে পারবে, তার কাছে অন্ধকার কবিতা। যে ফিরতে পারে না, তার কাছে অন্ধকার একটা দেয়াল।
“তাহলে আপনি চান সারা চরে বিদ্যুৎ আসুক,” আমি বললাম।
নূরজাহান অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর এমন একটা কথা বলল, যেটা আমি আমার পুরো ক্যারিয়ারে কারো মুখে শুনিনি।
“আমি আলো চাই।” সে নদীর দিকে তাকাল। “খালি এমন আলো চাই, যেইটা রাইত খাইয়া ফালায় না। আপনারা সেইরকম আলো বানাইতে জানেন?”
তিন
নূরজাহানের প্রশ্নটা নিয়ে আমি তিন রাত কাটালাম নিশিরচরে।
প্রতি রাতে একই নিয়ম। এশার পর বাতি নেভে, আকাশ নামে, জোনাকি ওঠে, আমি ঘুমাই। আড়াইটায় জাগি। মসজিদের সিঁড়িতে সোবহান চাচা বসে থাকেন, যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছেন। আমরা কথা বলি। ফজরের আগে আবার ঘুমাই।
তিন দিনে আমার মাথাব্যথা চলে গেল, যেটা দুই বছর ধরে ছিল। সকালে উঠে মনে হতো কেউ আমার ভেতরটা ধুয়ে দিয়েছে।
দ্বিতীয় রাতে আমি সোবহান চাচাকে নূরজাহানের কথা বললাম। তার মায়ের কথা, স্কুলের মেয়েদের চশমার কথা। ভেবেছিলাম তিনি রেগে যাবেন, অথবা ধর্মের কোনো কথা বলে ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবেন।
তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “মাইয়াটা ঠিক কয়।”
আমি অবাক হলাম।
“আমি আলোর দুশমন না, বাবা। কোনো মুরুব্বি আলোর দুশমন আছিল না। আমরা হারিকেন জ্বালাইছি, মশাল জ্বালাইছি, চান্দের আলোয় ধান কাটছি। আগুন আল্লার নিয়ামত, বিজলিও নিয়ামত। দোষ নিয়ামতের না। দোষ হইলো যখন মানুষ নিয়ামতের চাকর হইয়া যায়।”
তিনি আঙুল দিয়ে বালুতে একটা দাগ টানলেন।
“আলো দুই রকম। একটা আলো তুমি জ্বালাও দরকারে। প্রসবের ঘরে, রুগীর বিছানায়, বাচ্চার বইয়ের উপরে। কাম শেষ, নিভাইয়া দাও। আরেকটা আলো জ্বলে অভ্যাসে। কেউ দেখে না, কেউ পড়ে না, তবু সারারাইত জ্বলে। পয়লাটা মানুষের খাদেম। দুসরাটা মানুষের মালিক। তোমরা দুসরাটা বিলাও।”
“তাহলে কী করব, চাচা?”
“আলো রাখো ঘরের ভিতরে। আসমানে না।”
তিনি আকাশের দিকে ইশারা করলেন।
“আর চাবিটা রাখো মানুষের হাতে। বাজারের হাতে না।”
তৃতীয় দিন সকালে আমি চরের মানুষদের মসজিদের উঠানে ডাকলাম।
নূরজাহান এলো, তার স্কুলের মেয়েরা এলো, বুড়ো মাঝিরা এলো। আমি একটা প্রস্তাব দিলাম, যেটা আমার অফিসের কোনো ফর্মে নেই।
গ্রিডের লাইন আসবে না। আসবে সোলার। তিনটা ঘরে: স্কুল, মসজিদ, আর একটা নতুন প্রসূতি ঘর, যেটা চরের মানুষ নিজেরা বানাবে। প্রতিটা ঘরে উষ্ণ, হলুদাভ বাতি, নীলচে না। কোনো স্ট্রিটলাইট না। ঘাটে একটা মাত্র বাতি, শুধু নৌকা এলে জ্বলবে। প্রতিটা পরিবার চাইলে নিজের ঘরের জন্য ছোট একটা সোলার ল্যাম্প নেবে। আর চরের সবাই মিলে ঠিক করবে, এশার পর কোন আলো জ্বলবে, কোনটা না।
নূরজাহান সবার আগে হাত তুলল। তারপর বুড়ো মাঝিরা। তারপর সবাই।
শুধু একটা জিনিস আমি সেদিন বুঝিনি। উঠানে সোবহান চাচা ছিলেন না।
ফেরার দিন সকালে নূরজাহান স্কুলের দুইটা মেয়েকে সাথে নিয়ে ঘাটে এলো, প্রস্তাবের জন্য চরের সবার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাতে। মাঝি ছেলেটা তখন নৌকায় ইঞ্জিন গরম করছে।
নৌকায় ওঠার আগে আমি বললাম, “সোবহান চাচাকে আমার সালাম দিও। তিনি না থাকলে এই প্রস্তাবটা আমি কোনোদিন ভাবতে পারতাম না। গত তিন রাত তিনি আমাকে যা শিখিয়েছেন…”
নূরজাহান হঠাৎ এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি অচেনা ভাষায় কথা বলছি।
“কোন সোবহান?”
“সাঁঝের বুড়া। যিনি এশার বাতি নেভান। মসজিদের পাশে থাকেন।”
নূরজাহানের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঘাটের সেই কাঠের তক্তাটার দিকে হাত তুলল। এই চরে রাইত বেচা হয় না।
“সাঁঝের বুড়া আমার দাদাজান আছিলেন,” সে খুব আস্তে বলল। “এইটা তার হাতের লেখা। আটাশি সালের বন্যার আগে লেখছিলেন। বন্যার রাইতে উনি সারা চর ঘুইরা ঘুইরা হারিকেন হাতে মানুষরে উঁচা জায়গায় নিছেন। ফজরের আগে আর ফেরেন নাই। লাশ পাওয়া যায় নাই।”
সে আমার চোখের দিকে তাকাল।
“আমার জন্মের আগের কথা। আমি তারে কোনোদিন দেখি নাই।”
আমার পা বালুতে গেঁথে গেল।
“কিন্তু… আমি তিন রাত…”
“কোন সময়?”
“মাঝরাতে। আড়াইটার দিকে। মসজিদের সিঁড়িতে।”
নূরজাহান চোখ বন্ধ করল। একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর এমন গলায় বলল, যেন অনেক পুরনো একটা কথা মনে করছে।
“চরের বুড়িরা একটা কথা কয়। দুই ঘুমের মাঝখানে যারা জাগে, তারা মাঝে মাঝে মুরুব্বিগো দেখা পায়। যারা আগে চইলা গেছে, তারা ওই সময়টাতে ফিরা আসে, কারণ ওই সময়টা কারো দখলে নাই। দিনের না, রাইতের না, বাজারের না। খালি আল্লার।” সে চোখ খুলল। “শহরের মানুষ ওই সময় জাগে না। জাগলেও ফোন দেখে। তাই কোনোদিন কাউরে দেখে না।”
আমি কোনো যুক্তি খুঁজলাম। ক্লান্তি, নতুন জায়গা, অন্ধকারে চোখের ভুল, স্বপ্ন।
কিন্তু তিন রাতের প্রতিটা কথা আমার মনে আছে।
সূরা কাসাসের আয়াত, দুই রকম আলোর হিসাব, বালুতে টানা দাগ। ফেরার আগে আমি মসজিদের সিঁড়ির পাশের বালুটা দেখতে গিয়েছিলাম। দাগটা তখনো ছিল।
ঢাকায় ফিরে আমার প্রস্তাব অফিসে প্রায় বাতিল হয়ে যাচ্ছিল।
এক স্যার বললেন, “স্ট্রিটলাইট ছাড়া প্রকল্প? স্যাটেলাইটে তো কিছুই ধরা পড়বে না। লোকে বলবে, শতভাগের মধ্যে এখনো ফুটো।”
আমি সেদিন জীবনে প্রথমবার একজন সিনিয়রের সাথে গলা চড়িয়ে কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, “স্যার, আমরা কি মানুষের জন্য আলো দিচ্ছি, নাকি স্যাটেলাইটের জন্য?”
প্রকল্পটা পাস হয়েছিল। ছোট বাজেটে, কোনো ফিতা কাটা ছাড়া।
নিশিরচর এখনো স্যাটেলাইটের ছবিতে একটা কালো ছোপ। শুধু এখন আমি জানি, ওই কালো ছোপের ভেতরে একটা প্রসূতি ঘরে হলুদ বাতি জ্বলে। গত বছর সেখানে এগারোটা বাচ্চা জন্মেছে। একজন মা-ও মারা যাননি।
পরের শীতে আম্মা চরে গিয়ে নূরজাহানের চাচার কাছে প্রস্তাব নিয়েছিলেন।
বিয়েটা কীভাবে হলো, সেটা অন্য গল্প। শুধু এটুকু বলি, এখন আমাদের ঢাকার বাসায় এশার পর বাতি নেভে।
প্রথম প্রথম কঠিন ছিল। ফোনটা হাতে নেওয়ার জন্য আঙুল নিশপিশ করত। বারান্দার বাইরে স্ট্রিটলাইটের আলো এসে ঘরে ঢুকত, আমরা মোটা পর্দা লাগালাম।
পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের বাসায় কি কারেন্ট থাকে না? রাত নয়টায় সব অন্ধকার দেখি।” নূরজাহান হেসে বলেছিল, “থাকে ভাবি। আমরা রাখি না।”
আর মাঝরাতে এখন আমার ঘুম ভাঙে। আগে ভাঙলে ভয় পেতাম, ঘুমের ওষুধ খেতাম। এখন উঠে ওজু করি। জানালার পর্দা একটু সরিয়ে ঢাকার আকাশের দিকে তাকাই। ছায়াপথ দেখা যায় না, দুই-একটা তারা দেখা যায়। ওইটুকুই যথেষ্ট। ওইটুকু আমার। কেউ কিনতে পারেনি।
শেষ কবে আপনি নিজের চোখে ছায়াপথ দেখেছেন? শেষ কবে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ফোন না ছুঁয়ে শুধু অন্ধকারে বসে ছিলেন, নিজের সামনে, আল্লাহর সামনে?
যদি মনে না পড়ে, তাহলে একবার ভেবে দেখবেন, আপনার রাতটা এখন কার। আর কবে, কত দামে, কার কাছে আপনি সেটা বেচে দিয়েছেন।
আমরা দিন কিনতে গিয়ে রাত বেচে দিয়েছি। শুধু রসিদটা কেউ দেয়নি।
তবে একটা জিনিস আমি এখনো কাউকে বলিনি। নূরজাহানকেও না।
আমাদের মেয়ের বয়স চার। গত সপ্তাহে এক রাতে, ঠিক আড়াইটার দিকে, সে ঘুম থেকে উঠে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। চোখ পুরো খোলা, মুখ শান্ত।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে, মা?”
সে জানালার দিকে আঙুল তুলল।
“আব্বু, জানালার বাইরে একটা দাদু দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা লাইট। দাদু বলছে, এশা তো কবে হইছে, বাত্তি নিভাও।”
তারপর একটু থেমে, ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, বাত্তি মানে কী?”
আমি জানালার দিকে তাকালাম। পর্দার ফাঁক দিয়ে একটা হলুদ আলো দুলছিল। হারিকেনের আলো।
আমরা থাকি বারো তলায়।
নিশিরচর।
না লেখা গল্প।
১২-১০-২০২৬





